শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনায় উত্তাল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

বরিশাল ব্যুরো : বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) শের-ই-বাংলা আবাসিক হলে শাহজালাল নামের এক শিক্ষার্থীকে আটক করে নির্যাতনের ঘটনায় তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠণ করা হয়েছে। আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটিকে প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শের-ই-বাংলা হলের প্রভোস্ট মুহাম্মদ ইব্রাহিম মোল্লা জানান, মঙ্গলবার রাতে শাহজালাল নামের এক ছাত্রকে হলের মধ্যে আটকে রেখে নির্যাতনের ঘটনায় বুধবার দুপুরে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত সকল আবাসিক শিক্ষকদের ঘটনার বিষয়ে অবহিত করা হয়। এরপর আবাসিক শিক্ষক ইয়াসিফ আহমেদ ফয়সলকে আহবায়ক করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের জন্য তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠণ করা হয়েছে।

নির্যাতনের স্বীকার ববি’র ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র এবং শেরে বাংলা হলের ৪০১৬ নম্বর কক্ষের বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহজালাল জানান, মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১০টার দিকে ৪০১৬ নম্বর কক্ষ থেকে তাকে ডেকে ১০০১ নম্বর কক্ষে নিয়ে যায় জিওলজি এন্ড মাইনিং বিভাগের ছাত্র মোঃ শান্ত। সেখানে রুমের মধ্যে ঢোকার পর দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর তার মুখ বেঁধে মারধর ও নির্যাতন করা হয়। ওই রুমে তখন চারজন পরিচিতসহ কমপক্ষে আটজন অপরিচিত একইবর্ষের ছাত্ররা ছিলো। তাদের হাতে ছিলো রড ও দেশীয় ধারালো অস্ত্র। তারা তার (শাহজালাল) সামনে বসেই তাকে কোথায় নিয়ে কুপিয়ে মারবে সে বিষয়ে আলাপ করছিলো। একপর্যায়ে সে (শাহজালাল) দ্রুত দরজার সিটকানি খুলে দৌড়ে ৪০১৪ নম্বর রুমে আশ্রয় নেয়। অভিযুক্তরা ওই রুমে শাহজালালকে ধরে আনতে যায়। এসময় ওই রুমে থাকা শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে অভিযুক্তরা ব্যর্থ হয়।

শাহজালাল আরও জানায়, ওইদিন বঙ্গবন্ধু হলের বাংলা বিভাগের নাভিদ ও অর্থনীতি বিভাগের মোহাম্মদ সাইদের মধ্যে কক্ষ পরিবর্তন করা নিয়ে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে। এরজের ধরে প্রতিপক্ষের হামলায় সাইদ গ্রুপের চারজন আহত হয়ে শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি হয়। ওই জেরধরে সাইদের পক্ষের লোকজন তার (শাহজালাল) উপর নির্যাতন চালায়।

ববি’র অস্টম ব্যাচের শিক্ষার্থী জিদান, রাফি, ফারহান ও উচ্ছাসের ওপর হামলাকারীদের বহিস্কারের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধন চলাকালীন সময় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুম্মান হোসেন, জান্নাতুল ফেরদৌস, মেহেদী হাসান, জিহান মাহমুদ, ফাহিম হোসেন পিয়াস, জিহাদ রানা প্রমুখ। বক্তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র তাহমিদ জামান নাভিদ ও তার সহযোগি একই বিভাগের মোশারফ হোসেন, ইতিহাস বিভাগের ইয়াছিন হক ও বিধান সরকারসহ কতিপয় সন্ত্রাসীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হামলা চালিয়েছে। হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আমাদের চার সহপাঠীকে গুরুত্বর আহত করেছে। যারা বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বক্তারা আরও বলেন, হামলায় ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্র নাভিদের বাবার গাড়িতে করে আনা হয়েছে। এছাড়া নাভিদের বাবা সাবেক বিএনপি নেতা হামলার সময় ক্যাম্পাস সংলগ্ন এলাকায় তার গাড়িসহ অবস্থান করছিলো। বক্তারা অনতিবিলম্বে হামলাকারীদের বহিস্কারের মাধ্যমে ক্যাস্পাসকে সন্ত্রাসমুক্ত করার দাবি করেন। মানববন্ধন শেষে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন।

আহত রুম্মান হোসেন বলেন, মহানগর বিএনপি নেতার পুত্র তাহমিদ জামান নাভিদ দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ পরিচয় দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। নবীন শিক্ষার্থীরা তার সাথে রাজনীতি না করে আমাদের সাথে যোগ দেওয়ায় সে ক্ষিপ্ত ছিলো। তাই মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নিয়ে প্রথমে রাফি এবং পরে আমার ওপর হামলা চালায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী তাহমিদ জামান নাভিদ বলেন, রাফি প্রথমে সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে আমার বন্ধু হাফিজের ওপর হামলা চালায় এবং তাকে আটক করে রাখে। খবর পেয়ে আমরা হাফিজকে উদ্ধারের জন্য ক্যাম্পাসের সামনে আসার পরই আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এসময় উভয়ের মধ্যে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে।

অপরদিকে মঙ্গলবারের ওই হামলার পর রাতে অপর এক শিক্ষার্থীকে ববি’র শেরে বাংলা আবাসিক হলের একটি কক্ষে আটক করে নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। যা আগের হামলার ঘটনায় আহতদের সহযোগিরা করেছেন বলে দাবি করেছেন নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থী শাহজালাল। তিনি জানান, এ ঘটনায় হলের প্রভোষ্ট ও প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে ববি’র ছাত্রলীগ নেতা মহিউদ্দিন আহমেদ সিফাত জানান, বিষয়টি ছাত্রলীগের কোন বিষয় নয়, এটি সম্পূর্ণ সিনিয়র ও জুনিয়রদের দুটি ব্যাচের অভ্যন্তরীন কোন্দল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সুব্রত কুমার দাস বলেন, এ ঘটনায় যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রক্টরিয়াল বডির একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় গোটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করে জড়িতদের সনাক্ত করা হয়েছে। যার সবগুলো বিষয় উপাচার্যকে জানানো হয়েছে। বন্দর থানার ওসি আনোয়ার হোসেন তালুকদার বলেন, ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মঙ্গলবার রাত থেকে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।