🗓️ শুক্রবার ৯ ডিসেম্বর ২০২২ ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
   

মুসলিম আইনে বিয়ে ও তালাক
মো. জে আর খান রবিন:
প্রকাশ: শুক্রবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২২, ৫:৫৮ পিএম আপডেট: ১১.০১.২০২২ ১১:০৪ এএম | অনলাইন সংস্করণ


মানুষ কখনোই একা বসবাস করতে পারে না।   তাই বিবাহের মাধ্যমে একজন নারী ও পুরুষ সংসার জীবন শুরুর মধ্যে দিয়ে সামাজিক ভাবে বসবাস করে  থাকেন। অন্যদিকে প্রকৃতিগতভাবেই মানুষ পরস্পর বৈসাদৃশ্য পূর্ন। তাই স্বামী স্ত্রীর মধ্যে  তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদের মত ঘটনাও ঘটে থাকে। মুসলিম আইনে তালাকে তুচ্ছ  ভাব গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যদিকে  বিবাহ বন্ধনকে অটুট রাখাকে  আল্লাহর নেয়ামত হিসেবে বলা হয়েছে।  বিভিন্ন ধর্মে বিবাহ বা তালাকের বিভিন্ন রীতিনীতি থাকলেও মুসলিম আইনানুযায়ী  মুসলিম বিবাহ ও তালাক এর বিভিন্ন দিক রয়েছে।  

যে ব্যক্তি মুসলিম ধর্মে বিশ্বাস স্থাপন করে অর্থাৎ স্বীকার করে যে আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই এবং হযরত মোহাম্মদ (সঃ)  আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ তিনি একজন মুসলিম(ধারা -১৯)। মুসলিম বিবাহ কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয় বরং এটি একটি দেওয়ানি চুক্তি।(ধারা- ২৫০)। বিবাহ করার ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তি হল; সুস্থ ও প্রাপ্ত বয়স্ক ও বয়স্কা মুসলিম নর-নারী (ধারা-২৫১)। মুসলিম আইন অনুযায়ী বিবাহ তিন প্রকার বৈধ বিবাহ, বাতিল বিবাহ,  বাতিল যোগ্য বিবাহ(ধারা-২৫৩)।
বৈধ বিবাহের  উপদন হল; সুস্থ মস্তিস্কের অধিকারী সাবালক-সাবালিকা নর ও নারী, সাক্ষী হিসেবে দু'জন সুস্থ মস্তিস্কের অধিকারী সাবালক পুরুষ অথবা একজন সাবালক পুরুষ ও দুজন  মহিলা, একই অনুষ্ঠানে বিবাহের প্রস্তাব ও  গ্রহণ সম্পন্ন হওয়া,মোহরানা, ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ ব্যক্তিদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ না হওয়া(ধারা-২৫২)।

 অবৈধ বা বাতিল বিবাহ হল মুসলিম আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ ব্যক্তিদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া যেমন স্বগোত্রীয়, আত্মীয়তা, জ্ঞাতিত্বের মধ্যে সংঘটিত বিয়ে (২৬০-২৬২)।
অনিয়মিত বিবাহ হল এমন বিয়ে যা কিছু শর্তের  অভাব থাকে। ঐ শর্ত পূরণ  হলে সংঘটিত বিয়ে বৈধ হয়ে যায়। যেমন সাক্ষী ব্যতীত বিবাহের ক্ষেত্রে সাক্ষী বিবাহের চুক্তি পত্রে স্বাক্ষর করলে বিবাহ বৈধ হয়ে যায়(ধারা-২৫৪),৪ (চার) জন  স্ত্রী থাকতে ৫ম (পঞ্চম) স্ত্রী গ্রহনের ক্ষেত্রে একজন স্ত্রী মারা গেলে বা বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলে বিবাহ বৈধ হয়ে যায়(ধারা-২৫৫),কোন নারীর সাথে ইদ্দতকালীন বিবাহের ক্ষেত্রে  ইদ্দতকালীন সময় পার হয়ে গেলে বিবাহ বৈধ হয়ে যায়(ধারা-২৫৭),ধর্মের বিভিন্নতার কারণে নিষিদ্ধ বিবাহের ক্ষেত্রে ধর্মান্তরিত হলে বিবাহ বৈধ হয়ে যায়(ধারা-২৫৯)।স্ত্রী ছোট বোনের সাথে বিবাহের ক্ষেত্রে একজন স্ত্রী  মারা গেলে বা বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলে পরের বিবাহটি বৈধ হয়ে যায়(ধারা-২৬৩)।

অন্যদিকে তালাক একটি আরবী শব্দ এর বাংলা প্রতিশব্দ পরিত্যাগ করা বিচ্ছিন্ন করা বন্ধনমুক্ত বা মুক্তি। বিবাহবিচ্ছেদ সাধারণত স্বামীর মৃত্যুর পর ঘটে এবং তালাক দাম্পত্য জীবন বলবৎ থাকাবস্থায় ঘটে।

মুসলিম আইনের ৩০৭  ধারা অনুযায়ী বিবাহ বিচ্ছেদের বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে যথা; আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বামীর ইচ্ছা অনুযায়ী, আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার পারস্পরিক সম্মতির দ্বারা স্ত্রীর কর্তৃক আনীত মামলায়  আদালতের ডিক্রী দ্বারা।

অন্যদিকে তালাকেরও বিভিন্ন প্রকারভেদ রয়েছে যেমন; আহসান তালাক, হাসান তালাক, বাইন তালাক(ধারা-৩১১)।এ তিন প্রকার তালাক স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।তালাক ব্যতীত অন্যভাবেও বিবাহ বিচ্ছেদ হয় যেমন; তালাকে তওফিজ, ইলা তালাক, জিহার তালাক, খুলা ও যুবারত তালাক(ধারা-৩১৪-৩১৯)।তালাকে তৌফিজ হল স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা। ইলা ও জিহার তালাক হল ঘটনা সাপেক্ষে তালাক।খুলা তালাক হল স্ত্রীর ইচ্ছানুযায়ী স্বামীও স্ত্রীর মধ্যে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ। মুবারত তালাক হল স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের সম্মতিতে সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ।

তাছাড়াও  ১৯৩৯ সালের বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের ২ ধারা  অনুযায়ী কোন স্ত্রী তালাক প্রদানে ক্ষমতা প্রাপ্ত না হলে যৌক্তিক কারনে বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রীর জন্য পারিবারিক আদালতের আশ্রয় গ্রহন করতে পারেন।

তবে উল্লেখিত তালাকের মধ্যে বাইন তালাক ও তালাকে তৌফিজের ক্ষেত্রে১৯৬১ সালের  মুসলিম পারবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭ ধারার বিধান অনুযায়ী সালিসী পরিষদের চেয়ারম্যানকে বাধ্যতামূলক ভাবে  নোটিশ প্রদান করতে হবে।না করলে তা হবে আইনগত ভাবে অপরাধ।চেয়ারম্যান নোটিশ পাওয়ার পর ৯০ দিন অতিবাহিত হলেই তালাক কার্যকর হবে।তবে নোটিশ পাওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান আপোষ মীমাংসার লক্ষ্যে সালিশী পরিশোধ গঠন করবেন। অন্যান্য তালাকের ক্ষেত্রে সালিশী পরিশোধের চেয়ারম্যানকে  তালাকের নোটিশ পাঠানো শুধু আনুষ্ঠানিকতা মাত্র বাধ্যতামূলক নয়।

 বিবাহকে আল্লাহর নেয়ামত বলা হয়েছে।অন্যদেকে তালাককে ঘৃন্য বিষয় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।বৈধ  বিবাহের ক্ষেত্রে  স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে দেওয়ানী অধিকার সৃষ্টি করে(ধারা ২৬৫)। মুসলিম আইনের ২৫৫ ধারা মোতাবেক একজন স্বামী একসাথে  ৪(চার) জন স্ত্রী রাখার বিধান থাকলেও এক জন স্ত্রী একের অধিক স্বামী রাখার বিধান নেই (ধারা-২৫৬)। একাধিক স্বামীর ক্ষেত্রে পরের  বিবাহটি অবৈধ।এ জাতীয় বিবাহ হতে যে সন্তান জন্ম হবে তাকে অবৈধ বিবেচনা করা হবে এবং স্বীকৃতির মাধ্যমে তাকে বৈধ করা যাবে না।পূর্বের স্বামীকে তালাক প্রদান না করে কোন স্ত্রী অন্য পুরুষকে  বিয়ে করে দাম্পত্য জীবন পালন করলেও তা দন্ডবিধির ৪৯৪ ধারা মোতাবেক দন্ডনীয় অপরাধ। অন্যদিকে তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে ইদ্দতকালীন সময় পার হওয়ার পূর্বে কোন স্ত্রী লোককে বিয়ে করলে তা অনিয়মিত বিয়ে হবে, অবৈধ নয় এবং এ ক্ষেত্রে জন্মলাভকারী সন্তানও অবৈধ নয়(ধারা-২৫৭)।

পরিশেষে এটুক বলা যায়  সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাজ ব্যাবস্থার লক্ষ্যে সবাইকে ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় আইন মেনে চলা উচিত।।

আইনজীবী
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সাউথ বেঙ্গল গ্রুপ কর্তৃক প্রকাশিত
প্রধান উপদেষ্টা সম্পাদক : প্রফেসর ড. হারুন-অর-রশিদ
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. আশরাফ আলী
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আউয়াল সেন্টার (লেভেল ১২), ৩৪ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন : ০২-৪৮৮১১০৬১-৩, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত