ঢাকা, সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

দায়িত্বহীনতা-অবিশ্বাসে বাড়ছে বিচ্ছেদ

মিজান শাজাহান :

২০২১-০৩-২৪ ১৮:২০:১৫ /

ফাইলছবি

ভুল বুঝাবুঝি,অবিশ্বাস, পারিবারিক কলহ, আর্থিক সংকটসহ নানা কারণে দিন দিন বিবাহ-বিচ্ছেদ বেড়েই চলেছে। কাজী অফিসে তালাক নিবন্ধনের পাশাপাশি অনেকে আবার আলাদা হয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ তারা ডিভোর্স ও সেপারেশনকে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়ন করার চেষ্টা করছেন। এসব দম্পতি কাগজে-কলমে বিচ্ছেদ না করলেও সবধরনের সম্পর্ক থেকে দূরে থাকছেন। মুসলিম আইনের মতো সনাতন ধর্মের বিয়ে নিবন্ধন হয় না। তালাক বা বিচ্ছেদের জন্য সনাতন ধর্মে সরাসরি সুযোগ নেই। কিন্তু গবেষণায় দেখা যাচ্ছে অনেক হিন্দু দম্পতিও আলাদা হয়ে যাচ্ছেন। আবার তাদের নতুন করে অন্য সঙ্গীর সঙ্গে ঘর বাঁধারও উদাহরণ রয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত বিচ্ছেদ বাড়ার জন্য গবেষকরা দায়ী করেছেন পরস্পরের প্রতি বিশ্বাসের ঘাটতিকে। ড. জাফর সেলিম বলেন, ইংরেজিতে একটি কথা প্রচলিত আছে  Marriage is a trust . বাংলায় এ বক্তব্যের অর্থ বিয়ে নামক সামাজিক এবং পারিবারিক বন্ধনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় বিশ্বাস। আমাদের দেশে ঘটকালির মাধ্যমে আয়োজিত বিয়ের ক্ষেত্রে দু’জন অপরিচিত মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাসবোধের অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়া। আর এ বিশ্বাসে ফাটল ধরার কারণে সম্পর্ক ভেঙে যায় বলে মনে করেন এ গবেষক।

সম্পর্কে ফাটল ধরার জন্য দায়িত্বহীনতাকে দায়ী করেছেন মানসিক স্বাস্থ্য গবেষক সৈয়দ হুমায়ুন কবির। তার মতে বিচ্ছেদের বড় একটি কারণ পরকীয়া। আর তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ অনৈতিক সম্পর্ক সহজেই গড়ে ওঠছে বলে মনে করেন তিনি। কর্মব্যস্ত মানুষ পুরুষ (স্বামী) যখন কর্মস্থলে ব্যস্ত থাকেন তখন কোনো কোনো গৃহিণী বাসার কাজ শেষ করে একাকীত্ব বোধ করেন। আর তখন হয়তো তার সুসজ্জিত কোনো ছবির প্রতি অন্য পুরুষ আকৃষ্ট হয়ে তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে বসেন। একপর্যায়ে সেটি অনৈতিক সম্পর্কে গড়ায়। পরিণামে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ পর্যন্ত হচ্ছে। অন্যদিকে স্বামী হয়তো অফিসে বসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্য কোনো নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ছেন। আবার তার কর্মজীবী স্ত্রীও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছেন। অনেক সময় দেখা যায় সহকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের কারণে উভয়ের সংসারে অশান্তি নেমে আসে। সম্প্রতি রাষ্ট্রায়াত্ত্ব সোনালী ব্যাংকের একজন সহকারী মহাব্যবস্থাপককে (এজিএম) সহকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের কারণে চাকরি থেকে সাময়িক অব্যাহত দেওয়া হয়। অন্য সকল স্টাফকে এ ব্যাপারে সতর্ক ও পেশাদার আচরণ করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছে সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

শুধু যে ঘটকালির মাধ্যমে অনুষ্ঠিত বিয়ে বিচ্ছেদ হয়ে যাচ্ছে- বিষয়টা এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ১০-১২ বছর সম্পর্ক করে করা বিয়েও ৩-৬ মাসের মাথায় বিচ্ছেদ হচ্ছে। এমনকি বিয়ের একযুগ পর ২-৩টি বাচ্চা নিয়ে বিচ্ছেদ হওয়া নারীর সন্ধান গবেষণার স্যাম্পলে পাওয়া গিয়েছে। এ জন্য গবেষকরা বলেন, অবিশ্বাস তৈরি হওয়ার কারণেই এটা হচ্ছে। অর্থাৎ বিয়ের আগে পরস্পরের প্রতি যে বিশ্বাসটা ছিল সেটা পরে যেকোনো কারণে আর থাকেনি। তখন তারা আলাদা হওয়ার কথা ভাবতে শুরু করে দেয়। আর এজন্য গবেষক সৈয়দ হুমায়ুন কবির বলেন, স্বামীর উচিত কর্মস্থলে থেকেও দিনে অন্তত ২-১ বার স্ত্রীর খোঁজ নেওয়া। আর স্ত্রীরও উচিত স্বামী বাসায় ফিরলে সিরিয়াল দেখা নিয়ে ব্যস্ত না থেকে একটু যত্ন নেওয়া। সংসার করতে গেলে বিয়ের প্রথম ১ বা দেড় বছরের আবেগ আর থাকবে না- এটাকে প্রাকৃতিক বলে মন্তব্য করে এ গবেষক বলেন, ভুল বুঝাবুঝি হলে তখন নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করার চেষ্টা করতে হবে। তাতে ফল নাহলে অবশ্যই প্রাতিষ্ঠানিক কাউন্সিলিং প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সময় সুযোগ বুঝে ঘুরতে বের হওয়ার পরামর্শ দিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, ঘুরার জন্য বিনোদনকেন্দ্র, পর্যটনকেন্দ্রের পাশাপাশি হাসপাতালেও যেতে হবে।

ড. জাফর সেলিম বলেন, বিয়ে হলো দুজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের পরস্পর অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়া। একে অপরের প্রতি সৎ থাকা, একে অপরের সুখ দুঃখের সাথী হওয়া এবং একে অপরের সার্বিক দায়িত্ব নেওয়া। একসময় এসব অঙ্গীকারের প্রতিফলন আমাদের দেশে ছিল। আমাদের দাদা-দাদি, বাবা-চাচারা পারস্পরিক সুখ-দুঃখ ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েই একসাথে জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। কিন্তু বর্তমানকালে আধুনিকতার সংস্পর্শে এসে আমাদের সেই বিশ্বাস বোধ, দায়িত্ববোধ কেন জানি হারিয়ে যাচ্ছে। পাশ্চাত্য দেশগুলোর কথা দিয়ে যদি বলি- এসব দেশে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার ক্ষেত্রে কোনো বিধি-নিষেধ নেই। বরং অবাধ মেলামেশা অফিসে, সামাজিক আয়োজনে, পানশালা বা ডিস্কো- সর্বত্রই নারী পুরুষের সমান অধিকার এবং সমান অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে অনৈতিক বা পরকীয়া সম্পর্কের সূচনা হয়ে যেতে পারে। আবার আমাদের দেশে অনেক প্রবাসী কর্মজীবী মানুষদের ক্ষেত্রে, যাদেরকে জীবিকার প্রয়োজনে সহধর্মিণীদের দেশে আসতে হয়। তাদের একটা বড় অংশকেও এ ধরনের স্ত্রীর পরকীয়ার ঘটনায় বিব্রত হতে হয়। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় থেকে মুক্তির জন্য নৈতিক মূলবোধ জাগ্রতের বিকল্প নেই বলে মনে করেন কানাডা প্রবাসী এ গবেষক।

বাবু/ফাতেমা

এ জাতীয় আরো খবর

এস আলম গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্রে সংঘর্ষের নেপথ্যে

এস আলম গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্রে সংঘর্ষের নেপথ্যে

চট্টগ্রামে মডেল মসজিদ নির্মাণে নকল বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, হাতেনাতে ধরা

চট্টগ্রামে মডেল মসজিদ নির্মাণে নকল বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, হাতেনাতে ধরা

মামুনুলের আরও এক বান্ধবীর ফোনালাপ ফাঁস!

মামুনুলের আরও এক বান্ধবীর ফোনালাপ ফাঁস!

দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি জেলেরা : বাধ্য হচ্ছেন জাটকা নিধনে

দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি জেলেরা : বাধ্য হচ্ছেন জাটকা নিধনে

লঞ্চে ভাড়া বাড়লেও মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি

লঞ্চে ভাড়া বাড়লেও মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি

দায়িত্বহীনতা-অবিশ্বাসে বাড়ছে বিচ্ছেদ

দায়িত্বহীনতা-অবিশ্বাসে বাড়ছে বিচ্ছেদ