ঢাকা, সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

প্রতিবন্ধীদের মানুষ ভাবুন

অনন্য প্রতীক রাউত :

২০২১-০৪-০৪ ১৯:১১:০৪ /

অধিকারের প্রশ্নে সবাই সমান হিসেবে বিবেচিত। বাস্তবে কোনো মানুষই শারীরিক ও মানসিকভাবে সমান নয়। বিচিত্রতা মানুষের মাঝে বিরাজমান। তবে কিছু সংখ্যক মানুষ আছেন আমাদের সমাজে যারা কিনা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। সংকটের মাঝেও যারা এগিয়ে যেতে যান। স্বাভাবিকতাহীন অবস্থা যেন সমাজকে অস্বাভাবিক না করে তা নিশ্চিত করাই আমাদের দায়িত। তারাও ঠিক আপনার বা আমার মতো, সৃজনশীলতায় নেই পিছিয়ে- তবে মানুষ ভাবতেই কি এত সমস্যা?

বয়স, লিঙ্গ, জাতি, সংস্কৃতি বা সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী আর দশজন যে কাজগুলো করতে পারে ইমপেয়ারমেন্টের কারণে সে কাজগুলো প্রাত্যহিক জীবনে করতে না পারার অবস্থাটাই হল ডিসএবিলিটি বা প্রতিবন্ধীতা। ইমপেয়ারমেন্ট হল দেহের কোনো অংশ বা তন্ত্র যদি আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে, ক্ষনস্থায়ী বা চিরস্থায়ীভাবে তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারায় সে অবস্থাটিকেই বোঝায়। আমাদের চারপাশে এ ধরনের অসংখ্য মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। পূর্বের ন্যায় মানুষের সচেতনতা কিংবা প্রফেশনালিজম অবশ্যই বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবন্ধীদের অবস্থা তাই মন্দের ভালো এটা মানতে আপত্তি নেই। যদিও তৃণমূল পর্যায়ে অবস্থা সত্যিই খারাপ। ঘর থেকে শুরু করে সর্বদা তারা বিবেচিত হয় সমাজের বোঝা হিসেবে। অধিকার কিংবা সহানুভূতি তো সেখানে বিলাসিতার নামান্তর। অনেক সময় স্কুলে ভর্তির সময়ো পর্যাপ্ত সহযোগিতা পান না তারা।

মানুষ প্রতিবন্ধী হয় সাধারণত জেনেটিক কারণে; তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় মায়ের অযত্ন বা অসতর্কতার কারণেও এমনটা হয়ে থাকে। মায়ের সর্বাধিক সতর্কতা সেজন্য জরুরি। শহরের মায়েরা নিশ্চয়ই এক্ষেত্রে বিজ্ঞানসন্মতভাবে জীবনযাপন করার সম্ভাবনা বেশি থাকে। গ্রামে সুযোগ সুবিধা পূর্বের ন্যায় ভালো হলেও নানা কুসংস্কারের জন্য তারা নানা অনিরাপদ বিষয়ে নিজেদের আত্ননিয়োগ করে। ফলে অঘোষিত একটা ঝুঁকি রয়েই যায়। সুতরাং, সতর্কতার বিকল্প নেই। পরিবার পরিকল্পনাকে যতোটা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয় ঠিক তেমনি এসব বিষয়কেও সচেতনতা কর্মসূচির আওতায় আনা অতীব জরুরি। সতর্কতাই বদলে দিতে পারে বাস্তবতা। কেননা, একটি শিশু জন্মের প্রথম তিনমাসের মধ্যে তার সব অঙ্গ-প্রতঙ্গ তৈরি হয়ে যায়। তখন যা কিছু খাওয়া হয় সবই মায়ের কাছ থেকে বাচ্চার শরীরে যেতে পারে। এর প্রভাবেই শিশু সুস্থ হবে না অসুস্থ হবে- তা অনেকটাই বোঝা যায়। অনেক সময় দেখা যায় মা হয়তো ধূমপান করে না কিন্তু বাবা করে, এক্ষেত্রে মা পরোক্ষ ধূমপায়ী হয়ে যায়। শহরে সংখ্যায় কম হলেও প্রতিবন্ধীদের সমস্যা অনুভব করতে হয় না এমনটা বলা বোকামি হবে। বিশেষত দরকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা রাস্তায় তাদের চলাচলের আলাদা ওয়াক ওয়ে আছে কি? অনেকক্ষেত্রে পাড়ায় পাড়ায় গড়ে উঠা প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতেও দেখা যায় না এসব সুযোগ সুবিধা। শিশুপার্কে থাকা উচিত আলাদা ব্যবস্থা। আলাদা আলাদা বলে নিশ্চয়ই তাঁদের আলাদা গ্রহের ভাবা হচ্ছে না।  বরং তাদের প্রাপ্য সম্মানের জায়গাটা নিশ্চিত করার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে। সর্বক্ষেত্রেই তাঁদের জন্য আলাদা বিশেষত সুবিধা রাখা উচিত।

ইতিহাস বলে তারা প্রতিভাবান ও সৃজনশীল। নিশ্চয়ই জানেন টমাস আলভা এডিসন গামলার পানিতে পা না ডুবিয়ে কাজ করতে পারতেন না। লিখতে পারতেন না। বহু নামি খেলোয়াড়-বিজ্ঞানী-কবি ছিলেন যাঁরা মাথা নাড়তেন, বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে ওপরে তাকাতেন, কেউ কেউ বিড়বিড় করতেন অথচ এদের সাফল্য আকাশচুম্বি। এরাও কোনো না কোনো ভাবে দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান প্রতিবন্ধী ছিলেন। তাদের অবহেলা করার অর্থ একটাই- সমাজ ও দেশকে পিছনে ঠেলে দেওয়া।

বর্তমানে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু-কিশোরদের জন্য রয়েছে বিশেষায়িত স্কুল। বিশেষত এরা সৃজনশীল কাজে দক্ষতার পরিচয় দেয় সচারাচর। সেজন্য রাষ্ট্রের সহযোগিতায় সর্বদাই তাদের জন্য সে ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। সহযোগিতার গতিধারাকে আরো গতিশীল করা প্রয়োজন। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ৭ ভাগেরও অধিক প্রতিবন্ধী। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বর্তমানে ১৬ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৮ জন। সংখ্যা বলি বা বাস্তব দুরাবস্থা প্রতিবন্ধীরা যদি মূলধারার অংশ হতে না পারে তবে সেটার প্রভাব নিশ্চয়ই দেশের সার্বিক অগ্রগতিতে পড়বে। তাদের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে তাই সবাইকেই যথেষ্ট সচেতন হতে হবে। সরকার করবে, প্রশাসন বসে আছে কেন এসব না ভেবে বদলাতে হবে মানসিকতা। প্রচলিত নীতি কথার মতো শোনালেও এটাই চিরন্তন সত্যি এবং অবশ্যই বাস্তব।

মানসিকতার পাশাপাশি প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষার জন্য আইনগত কাঠামোকে শক্তিশালী করাও খুব জরুরি; যেন সুরক্ষা পায় পিছিয়ে পড়া মানুষগুলো। প্রশ্ন আসতে পারে তাহলে কি প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষায় সময়োপযোগী আইন নেই? প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন (২০১৩), নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন (২০১৩)এবং পুনর্বাসন  কাউন্সিল আইন (২০১৮) রয়েছে। যা অবশ্যই সুবিধা বঞ্চিতদের সুরক্ষায় রাখতে পারে কার্যকরী ভূমিকা । তবে, নামমাত্র আইন থাকলে আদৌ কি লাভ আছে? আইন তখনই সুরক্ষা দেয় যখন সেটার কার্যকরী বাস্তবায়ন সম্ভব হয়। প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশে আইনগত বাস্তবায়নকে আরো জোরদার করা প্রয়োজন। মানসিকতার পাশাপাশি আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে মানুষের ভাবনা কোনদিন বদলাবে না।

প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদা সম্পন্নদের ভিন্ন নজরে নেওয়ার অর্থ সমাজ, দেশ বা রাষ্ট্রকে পিছিয়ে পড়তে এগিয়ে দেওয়া। দিবস কেন্দ্রিক ভাবনা ভাবলে তা শুধুই ভাবনা হয়ে থাকে। সুতরাং অন্ধকার বেড়াজালের নেতিবাচক মানসিকতায় আটকে থাকার আর সুযোগ নেই। বিশ্ব চলেছে এগিয়ে- তবে আমরা কেন থাকবো পিছিয়ে? প্রতিবন্ধীদের মানুষ ভাবুন, পৃথিবীকে অগ্রগামী রাখুন। জয় হোক মনুষ্যত্বের।

লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

বাবু/ফাতেমা

এ জাতীয় আরো খবর

করোনায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার শঙ্কা

করোনায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার শঙ্কা

মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী মুজিবনগর সরকার

মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী মুজিবনগর সরকার

আমাদের জন্য কঠোর লকডাউনের বিকল্প নেই

আমাদের জন্য কঠোর লকডাউনের বিকল্প নেই

বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক খাতে করোনা মহামারির প্রভাব

বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক খাতে করোনা মহামারির প্রভাব

বঙ্গবন্ধুর ডাকা সেই খোকা আমি জাবেদ

বঙ্গবন্ধুর ডাকা সেই খোকা আমি জাবেদ

ভূগর্ভস্থ পানি  ও আমাদের ভবিষ্যৎ

ভূগর্ভস্থ পানি ও আমাদের ভবিষ্যৎ