ঢাকা, সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

দিন বদলের পালায় আগামী বাংলাদেশ

নেজাম উদ্দিন

২০২১-০৪-০৭ ২১:২৭:২৮ /

পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক দেশটির জন্ম হয় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। দীর্ঘ নয়মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম, ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তে রঞ্জিত এই উর্বর ভূমি, সাহসী সন্তানেরা উষ্ণ এই মৃত্তিকা খণ্ডকে  দিয়েছে অপরাজেয় এক মহিমা। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এদেশের গণতন্ত্রমনা  মানুষদের অভ্যুত্থান, মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের লড়াই, দুইশো বছরের ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তির লড়াই আর দেশজুড়ে শ্বাপদের মতো নিঃশব্দ-হিংস্র সামন্তদের বিরুদ্ধে ভাগচাষী ভূমিহীনদের মাথা তুলে দাঁড়াবার আন্দোলনের ইতিহাস- বাঙালি জাতিকে একটি সংগ্রামী সাহসী জাতি হিসেবে পৃথিবীতে স্বীকৃতি দিয়েছে।

বাংলাদেশের ইতিহাস- বাঙালির পরাধীনতার শিকল ভাঙ্গার অনন্য সাহসীকতার ইতিহাস। হাজার বছর ধরে বাঙালি তার শিক্ষা-সংস্কৃতি, ভাষা, স্বাধীনতাসহ নিজ অধিকার আদায়ে কঠোর সংগ্রাম করে আসছে। মুক্তির তাড়নায় বারবার শত্রুর অস্ত্রের মুখে দাঁড়িয়েও মুক্তির অদম্য চেতনাকে হারাতে দেয়নি। বাঙালি তার অধিকারের জন্য, স্বাধীনতার  জন্য নিঃসংকোচে জীবন পর্যন্ত বিলিয়ে দিয়েছে। বাঙালি বীর সন্তানদের রয়েছে বিজেতা শাসক এবং অধিকার হরণকারীদের মোকাবেলা করার গৌরবান্বিত ইতিহাস, আছে যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশে শত্রুর মোকাবেলা করার মতো অদম্য সাহস। এ জন্যই কবি সুকান্ত বলেছেন,  ‘সাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়; জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার, তবুও মাথা নোয়াবার নয়।’

দেশ আজ স্বাধীনতার পাঁচটি দশক অতিক্রম করেছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ঘটেছে। কিছু ক্ষেত্রে আমরা যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা, সৃজনশীলতা এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতার পরিচয় রেখেছি। পরিবেশ সংরক্ষণ, নারী ক্ষমতায়ন, অলাভজনক উন্নয়ন উদ্যোগ; বিশেষ করে ক্ষুদ্রঋণ এবং গ্রামীণ অনানুষ্ঠানিক খাতের বিকাশের ক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক উদ্যোক্তরা যথেষ্ট সাফল্য দেখিয়েছেন। এদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও পুঁজির ব্যবস্থা করে দিতে পারলে দেশের উন্নয়নে অসাধ্য সাধন করতে পারবে এই তরুণ মেধাবী উদ্যোক্তারা। দেশের অন্যতম ব্যবসায়ী সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিজিসিআই) ‘ভিশন টু থাউজেন্ড টুয়েন্টি ওয়ান’ শীর্ষক উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনায় এই মর্মে মন্তব্য করেছিল যে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৪ সীমিত রেখে ২০১৪ হতে ২০২১ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার ৭ শতাংশ অর্জন করতে পারলে বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মাঝারি আয়ের দেশে পরিণত হতে পারবে। 

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরামর্শক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘প্রাইস ওয়াটার হাউজ’ দাবি করেছে,  আগামী ২০৫০ সালের বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দিবে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন -এর মতো দেশগুলো। এছাড়া ৩০টি সম্ভাব্য নেতৃস্থানীয় দেশের তালিকা প্রণয়ন করেছে প্রতিষ্ঠানটি, যারা ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হবে। এই তালিকায় বাংলাদেশের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।  দেশের কৃষিতেও এসেছে ব্যাপক সাফল্য। বাংলাদেশ আজ কৃষিতে যে আত্মনির্ভরশীলতা দেখাচ্ছে, তা ১৫ বছর আগেও কল্পনা করা যেত না। আর এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে কৃষিখাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। বিশেষ করে হাইব্রিড প্রজাতির উদ্ভাবন ও উন্নত জাতের শস্যের চাষাবাদ, আধুনিক সেচ-পদ্ধতি ও কৃষির বহুমুখীকরণ কৃষি উৎপাদন বাড়িয়েছে কল্পনাতীতভাবে। কৃষিজাত দ্রব্যের রপ্তানিতেও দেশ এখন অনেকটা এগিয়েছে। বর্তমানে দেশে খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ ৪ কোটি মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে, ফলে আমাদের খাদ্য চাহিদার মাত্র ১০-১৫ শতাংশই এখন আমদানি করতে হয়।

স্বাধীনতার পর থেকেই প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ দেশের অর্থনীতিতে, বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে আসছে। প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে আড়াই থেকে তিন লক্ষ জনশক্তি রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এ যাবৎ প্রায় ত্রিশ লক্ষ বাংলাদেশি নাগরিক পৃথিবীর নানা দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ খাত থেকে দেশের অর্থনীতিতে ৭-৮শ’ কোটি ডলার যোগ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশেও প্রস্তুতি চলছে- একটি আত্নমর্যাদাশীল দেশ হিসাবে সম্মানজনকস্থানে অধিষ্ঠিত হতে। কিন্তু সম্প্রতি আমাদের সমাজে নানা বিশৃঙ্খলা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে স্বার্থান্বেষী কিছু মানুষ মেতে উঠেছে ক্ষমতাধর হওয়ার প্রতিযোগিতায়। কল্যাণমুখী রাজনীতি আজ অনেকাংশে হয়ে পড়েছে কলুষিত। সমাজ জীবনের অলিতে-গলিতে বিশৃঙ্খলা ভয়াবহরূপ ধারণ করছে, যা যুবসসমাজকে বিপথগামী করেছে, ফলে সমাজের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতির কালো থাবা বিস্তৃতি লাভ করেছে। তারপরও দেশের মানুষ স্বাধীনতার এই সুবর্ণজয়ন্তীতে স্বপ্ন দেখছে সুখী-সমৃদ্ধ এক আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশের।  মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার অঙ্গীকার- ক্ষুধা-দারিদ্র্য-নিরক্ষরতা, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের অভিশাপমুক্ত উন্নত ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার বেশকিছু প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশ গঠন ও দেশ পরিচালানায় তরুণদের অংশগ্রহণ, তাদের সৃজনশীলতা বিকাশের সর্বোচ্চ সুযোগ করে দেওয়াসহ সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী উদ্যোগ সমাজের সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে।

দিন বদলের পালায় আমরা সামনের দিকে এগোচ্ছি প্রতিনিয়ত। অপার সম্ভাবনার এই দেশের  সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর সময় এসে গেছে। পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো হলে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকবেনা, বরং দিনবদলের এ ধারা অব্যাহত রেখে দেশ নেতৃত্ব দিবে বিশ্ব দরবারে। আর এর জন্যে সামনের দিনগুলোতে একটি উন্নত ও আধুনিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বাবু/জেআর

এ জাতীয় আরো খবর

করোনায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার শঙ্কা

করোনায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার শঙ্কা

মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী মুজিবনগর সরকার

মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী মুজিবনগর সরকার

আমাদের জন্য কঠোর লকডাউনের বিকল্প নেই

আমাদের জন্য কঠোর লকডাউনের বিকল্প নেই

বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক খাতে করোনা মহামারির প্রভাব

বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক খাতে করোনা মহামারির প্রভাব

বঙ্গবন্ধুর ডাকা সেই খোকা আমি জাবেদ

বঙ্গবন্ধুর ডাকা সেই খোকা আমি জাবেদ

ভূগর্ভস্থ পানি  ও আমাদের ভবিষ্যৎ

ভূগর্ভস্থ পানি ও আমাদের ভবিষ্যৎ