ঢাকা, সোমবার, ১৭ মে ২০২১ ই-পেপার

অপসংস্কৃতি ও সংস্কৃতির দ্বান্দ্বিকতা

শাকিবুল হাসান

২০২১-০৪-২৯ ২০:০২:৪২ /

সংস্কৃতি মানে সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে, মহৎভাবে বাঁচা। অর্থাৎ বেঁচে থাকার জন্য মানুষের নৈমিত্তিক প্রচেষ্টাই সংস্কৃতি, আর অপসংস্কৃতি হলো এর বিপরীত। আত্মার মৃত্যু ঘটিয়ে অসুন্দরের উপাসনা করে, অকল্যাণের হাত ধরে বেঁচে থাকাই অপসংস্কৃতি। অপসংস্কৃতি মানুষকে কলুষিত করে এবং জীবনের সৌন্দর্যের বিকাশকে স্তব্ধ করে দিয়ে শ্রীহীনতার দিকে ঠেলে দেয়। জীবনের সাথে সংস্কৃতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।

বাংলাদেশে জাতীয় জীবনে অপসংস্কৃতির প্রবল প্রতাপ লক্ষণীয়। অসুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ব্যক্তিগত লোভ-লালসা চরিতার্থ করার এক উদ্ভট জোয়ার চলছে এদেশে। বিশেষত এদেশের তরুণ সমাজ আজ দিশেহারা। তাদের বেঁচে থাকার সাথে নীতির সম্পর্ক নেই। এই বোধ থেকেই অপসংস্কৃতির জন্ম হয়। সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা এখন হাস্যকর। দুর্নীতি এখন সামাজিকভাবে স্বীকৃত। আর এখন অনৈতিকতার সূত্রপাত হচ্ছে মানুষের অসৎ জীবিকার্জনের হাত ধরে। সৎভাবে যে জীবিকার্জন না করে তার পক্ষে অপসংস্কৃতির দাসত্ব ছাড়া উপায় নেই। অশ্লীলতা, নোংরামি, প্রতারণা- এসবই অপসংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন নাম। আমাদের সমাজ আজ এসবেরই দাসত্ব করে চলেছে।

আজকের তরুণেরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। কিন্তু অপসংস্কৃতি তাদের জীবনকে ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। যুবসমাজের একটা বড় অংশকে সুকৌশলে করা হয়েছে আদর্শভ্রষ্ট। সুন্দর জীবনের পথ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অন্ধকার জীবনের পথে। তারা তলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার জগতে, অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে মাদকের নেশায়। বিপুল সংখ্যক তরুণের  জড়িয়ে যাচ্ছে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ডে।

বিশ্বায়নের প্রত্যক্ষ ও বাহ্যিক প্রভাব আমাদের তরুণ প্রজন্মের কথাবার্তার পরিবর্তন। বর্তমান শিশুরা বাবা-মাকে বাংলা ভাষায় সম্বোধন না করে বিদেশি ভাষা বিশেষত ইংরেজিতে পাপা, মাম্মি বা মম ডাকতে আগ্রহী। কথায় কথায় তারা অন্য ভাষার শব্দ ব্যবহার করে। বাংলা ইংরেজি, হিন্দি একসাথে মিলিয়ে পরস্পরের সাথে কথা বলে, একে তারা আধুনিকতা মনে করে। তাছাড়া বাংলা শব্দের বিকৃতি এখন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। বর্তমান আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সভ্যতার যুগে স্যাটেলাইটের ইতিবাচক দিকগুলো অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। মানুষও সেই সাথে তার নৈতিক আদর্শ বিসর্জন দিয়ে তাদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতির গৌরবোজ্জল অহংকারকে ধূলোয় মিশিয়ে অপসংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে। 

বর্তমান বিশ্ব আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নয়ন-প্রসারতার যুগ। এ যুগে চলেছে প্রতিযোগিতামূলক একটি ব্যস্ততম সময়, এখন সচেতন মানবসমাজ জীবনের গতি পরিবর্তন করতে সক্ষম হচ্ছে। সেই সাথে সময়কে তারা কজে লাগিয়ে সর্বদা সম্মুখে এগিয়ে চলছে। পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে বিশ্বসম্রাজ্যের বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় আমাদের নেই। তাই এর মধ্যে থেকেই নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব আর স্বার্থকে বাঁচিয়ে রেখে চলতে হবে। যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুব সমাজের এই বিপথগামিতা, সেই পরিবেশের আমূল সংস্কার অপরিহার্য। এ ব্যাপারে সব শ্রেণির মানুষকে সচেতন হতে হবে। নিষিদ্ধ করতে হবে অপসংস্কৃতির বেসাতি। তাদের অনুপ্রাণিত করতে হবে স্বকীয় মূল্যবোধে। সুযোগ দিতে হবে আত্মবিকাশের।

আদর্শভ্রষ্টতাই এ কালের যুব সমাজের একমাত্র চিত্র নয়। এক শ্রেণির যুবসমাজ বেশ সক্রিয়, সজাগ ও আদর্শবাদী। সামাজিক অবিচার, অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক শঠতা সবকিছুর বিরুদ্ধেই এরা সোচ্চার। তাই আজ যারা অপসংস্কৃতির বেড়াজালে আটকে গিয়ে অলস তন্দ্রায় আচ্ছন্ন, সঠিক পথনির্দেশনা পেলে এই যুবসমাজই আবার উজ্জীবিত হবে দুর্বার প্রাণশক্তিতে। ফিরে পাবে তাদের হারানো শুভবুদ্ধি। যুবসমাজকে অপসংস্কৃতি থেকে রক্ষা করতে হলে বিদেশি সংস্কৃতির দরজা বন্ধ করে নিজেদেরকে আরও বেশি প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তুলতে হবে। দেশীয় সংস্কৃতির লালন করতে হবে। আর বিদেশি সংস্কৃতির মোকাবেলায় টিকে থাকার জন্য দেশীয় সংস্কৃতিকে করে তুলতে হবে যুগোপযোগী। বিদেশি সংস্কৃতি অনুসরণ ও অনুকরণের ক্ষেত্রে আরও বেশি সজাগ হতে হবে। বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রকাশই আভিজাত্যের পরিচায়ক তরুণদের এ ধারণা ঘোচাতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, বরেন্দ্র কলেজ রাজশাহী

এ জাতীয় আরো খবর

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট ও নিরপেক্ষ নৈতিকতা

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট ও নিরপেক্ষ নৈতিকতা

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের চার দশক : শেখ হাসিনার হাতেই নিরাপদ বাংলাদেশ

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের চার দশক : শেখ হাসিনার হাতেই নিরাপদ বাংলাদেশ

সুনীল অর্থনীতি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

সুনীল অর্থনীতি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

ঈদ আনন্দে বৈষম্য নয়

ঈদ আনন্দে বৈষম্য নয়

কঠিন সময় ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি মানুষ

কঠিন সময় ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি মানুষ

করুণা করে হলেও ঈদকার্ড দিও

করুণা করে হলেও ঈদকার্ড দিও