ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১ ই-পেপার

’৭৮ এর ৩ জুন : গণতন্ত্র হত্যার সেই দিন

খায়রুল আলম

২০২১-০৬-০৩ ১৬:৪২:২৮ /

১৯৭৫ সালের ১১ নভেম্বর বেতার ও টেলিভিশন ভাষণে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘আমি রাজনীতিবিদ নই। আমি একজন সৈনিক।.... রাজনীতির সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই এবং আমাদের সরকার সম্পূর্ণ নির্দলীয় ও অরাজনৈতিক।’ এরপর ১৯৭৬ সালের মে মাসে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘আমি একজন শ্রমিক।’

একজন ‘শ্রমিক’ ও ‘সৈনিক’ কিভাবে একের পর এক সিঁড়ি পেরিয়ে ক্ষমতার শীর্ষে চলে যেতে পারেন, তার একটা চিত্রনাট্য আগেই লিখে রেখেছিলেন পাকিস্তানের সেনাপতি আইয়ুব খান। জেনারেল জিয়া এ চিত্রনাট্য ধরেই এগুতে থাকেন এবং অবশেষে গন্তব্যে পৌছে যান। 

আর এভাবেই ১৯৭৮ সালের ৩ জুন কথিত এক নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি নিজে স্বাধীন সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্ট বলে যান। যদিও তিনি ওই সময় ছিলেন একাধারে কমান্ডার ইন চিফ, চিফ অব স্টাফ এবং চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর পদে আসীন।

গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার বইতে লিখেছেন, বিএনপি এমন একটি দল, যার জন্ম স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয়নি। এই অঞ্চলে সবদলের জন্ম হয়েছে ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে, রাজপথে কিংবা আলোচনার টেবিলে। বিএনপি সেদিক থেকে ব্যতিক্রম। দলটি তৈরি হলো ক্ষমতার শীর্ষে থাকা একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তির দ্বারা, যিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে তিনি রাজনীতি করবেন।

একসময় তিনি বলেছিলেন, ‘আই উইল মেক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট।’ অর্থাৎ তিনি রাজনীতি কঠিন করে দেবেন। নানা বিধিনিষেধের বেড়াজালে অনেকের জন্যই রাজনীতি কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু জিয়া রাজনীতিতে তাঁর উত্তরণ ঘটান সহজেই। রাজনীতিবিদ হতে হলে মাঠে-ঘাটে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতে হয়। হাতের তর্জনী তুলে গর্জন করতে হয়।জিয়া এ বিষয়ে একেবারেই নবিশ। অথচ রাজনীতিতে পারঙ্গম হতে হলে জনগণের সাথে মিশে যেতে হবে।

মশিউর রহমান যাদু মিয়ার ভাই মোখলেসুর রহমানের (সিধু ভাই) একটি সাক্ষাতকারকে উদ্ধৃত করে মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, ‘জিয়া বাংলা লিখতে-পড়তে জানতেন না। প্রথম দিকে তিনি বাংলায় যে বক্তৃতা দিতেন, সেগুলো উর্দুতে লিখতেন। তারপর সেটি দেখে বক্তৃতা দিতেন। তিনি ভালো করে বক্তৃতা দিতে পারতেন না। দিতে গেলে খালি হাত-পা ছুঁড়তেন।’

মোখলেসুর রহমানের সাক্ষাতকার গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর বইতে এভাবে তুলে ধরেছেন, ‘এসব দেখেটেখে যাদু একদিন আমাকে বললো যে, এ রকম হলে কী করে তাঁকে আমি চালিয়ে নেব?আমি বললাম, দেখো জিয়া বক্তব্য দিতে পারেন না ঠিক আছে। তিনি সবচেয় ভালোভাবে কী করতে পারেন, সেটা খুঁজে বের করো। জবাবে যাদু বললেন, হাঁটতে পারেন এক নাগাড়ে ২০ থেকে ৩০ মাইল পর্যন্ত। আমি বললাম এইতো পাওয়া গেল সবচেয়ে ভালো একটা উপায়, তুমি তাঁকে সঙ্গে নিয়ে পাড়াগাঁয়ে হাঁটাও। .... গাঁও গেরামের রাস্তা দিয়ে যাবে আর মানুষজনকে জিজ্ঞেস করবে, কেমন আছেন? প্রেসিডেন্ট দেশের মিলিটারি লিডার, তিনি গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কানাকানচি দিয়ে ঘোরাঘুরি করছেন আর লোকজনের ভালো-মন্দের খোঁজ খবর করছেন, তাতেই তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠবেন।
মোখলেসুর রহমানের ভাষ্য হচ্ছে, এভাবে দেখতে দেখতে জিয়াউর রহমান বক্তব্য দেয়াটাও রপ্ত করে ফেললেন। যেখানে কোনদিন ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানও যাননি, সেখানে খোদ দেশের প্রেসিডেন্ট যাচ্ছেন। সেটা এক বিশাল ব্যাপার।

জিয়াউর রহমান স্বভাবে ছিলেন ধীর-স্থির। তিনি এক-পা, দুই-পা করে এগুচ্ছিলেন। তিনি মনে করলেন, তাঁর একটা ঘোষণাপত্র বা কর্মসূচি থাকা দরকার। উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর জোর দিয়ে ১৯৭৭ সালের ২২শে মে ‘আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে’ জেনারেল জিয়া ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

তিনি তখনো একজন সামরিক শাসক। সেনাবাহিনীতে দৃশ্যত তাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউ ছিলনা। দেশের ভেতরে রাজনৈতিক বিরোধীরা বিভক্ত, বিচ্ছিন্ন এবং দিশেহারা। তারপরেও জিয়াউর রহমানকে প্রমাণ করতে হবে, তাঁর পেছনে জনসমর্থন আছে; শুধু বন্দুকের জোরে ক্ষমতায় বসেননি। তাঁর প্রতি জনগণের আস্থা আছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য হ্যাঁ-না ভোট নেয়া হলো। নির্বাচন কমিশন জানাল, দেশের ৮৮.৫০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছে এবং তাদের মধ্যে ৯৮.৯ শতাংশ হ্যাঁ ভোট দিয়েছে। ভোটার উপস্থিতির এ হার মোটেও বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। গণভাটের মাধ্যমে রাজনৈতিক বৈধতার একটি ছাড়পত্র তৈরি করলেন জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমান ইতোমধ্যে রাজনীতিবিদদের যোগাযোগ শুরু করে দিয়েছিলেন। প্রথমদিকে তিনি যাঁদের সাথে কথাবার্তা বলা শুরু করেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভাসানী-ন্যাপের সভাপতি মশিউর রহমান যাদু মিয়া। ১৯৭৫ সালে যারা ঢাকঢোল পিটিয়ে বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন, মধ্য আগস্টে গণেশ উল্টে যাওয়ায় তাদের অনেকেই বাকশালের গালমন্দ করার প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, নতুন শাসকদের কৃপা পাওয়া। জিয়াউর রহমান এসব রাজনীতিবিদকে দেখতেন কিছু করুণা আর কিছু ঘৃণা নিয়ে।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দল তৈরির প্রক্রিয়াটিতে বৈচিত্র্য ছিল। তিনি সবকটি ডিম এক ঝুড়িতে রাখতে চাননি। দল তৈরির কাজে অনেক ব্যক্তি ও মাধ্যমকে ব্যবহার করেছন। জিয়াউর রহমান একদিকে ‘সমমনা’ রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে একটি রাজনৈতিক জোট তৈরির কাজ করছেন, অন্যদিকে তিনি নিজস্ব একটা রাজনৈতিক দল তৈরির বিষয়টিও খুব গুরুত্বের সাথে দেখলেন। তাঁর মনে হলো জোটের মধ্যে শতভাগ অনুগত একটা দল না থাকলে জোটকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। সে লক্ষে ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে 'জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’ বা ‘জাগদল’ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল তৈরির ঘোষণা দেন। তিনি নিজে থাকলেন নেপথ্যে। জাগদল রাজনীতিতে তেমন ঢেউ তুলতে পারেনি। রাজনৈতিক মাঠের চেনা মুখগুলো জাগদলে খুব কমই যোগ দিয়েছিল।

১৯৭৮ সালের ২৮ এপ্রিল জিয়াউর রহমান নিজেই নিজেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে পদোন্নোতি দিলেন। ১৯৭৮ সালের ১ মে জিয়াউর রহমানকে চেয়ারম্যান করে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ ঘোষণা করা হলো। জিয়া যদিও সেনাবাহিনীর প্রধান, তিনি পুরাদস্তুর রাজনীতিবিদ বনে গেলেন। ১৯৭৮ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করা হলো। 

১৯৭৮ সালের ৩ জুন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির জন্য প্রথম গণনির্বাচন। সেনাবাহিনীর প্রধান পদে থেকেই নির্বাচনে লড়েছিলেন জিয়াউর রহমান। এই নির্বাচন ছিল বাংলাদেশকে কলঙ্কিত করারই নির্বাচন। কেননা, দেশের সংবিধান ও আইন অনুযায়ী সরকারি কোনো পদে থেকে কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। কিন্তু জিয়া ছিলেন কমান্ডার ইন চিফ, চিফ অব স্টাফ এবং চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর পদে আসীন। 

সে সময়টায় দেশে সামরিক আইন জারি থাকার কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর মিছিল-সমাবেশসহ সব কর্মসূচির ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে দুঃখ ও অনুতাপের বিষয় এই যে, বেগম খালেদা জিয়াসহ বিএনপি সংশ্লিষ্ট সবার মুখে বারবার শুনে আসছি ‘জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা’। কেমন ছিল ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের’ নির্বাচনগুলো? কেমন ছিল ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের’ সেই দিনগুলো?

১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার প্রায় ৪০ দিন পর জুনের ৩ তারিখে নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে ওই বছরের ১ মার্চ থেকে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। সেদিন জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলসহ (জাগদল) ৬টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠিত হয়।

মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ছিলেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টপ্রার্থী। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ৫টি দলের সমন্বয়ে গঠিত গণঐক্য জোটের প্রার্থী জেনারেল (অব.) এম এ জি ওসমানী। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও নির্বাচন কমিশন থেকে ভোটার তালিকা বিক্রি হচ্ছিল ৬০ হাজার মার্কিন ডলারে। মাত্র ৪০ দিনের মধ্যে জেনারেল ওসমানীর পক্ষে নির্বাচনি তহবিল সংগ্রহ করে পোস্টার ছাপানো কিংবা ভোটার তালিকা কেনার সামর্থ্য ছিল না। নির্বাচনি প্রচারণার শুরু থেকেই জেনারেল ওসমানী বিভিন্ন অনিয়মের কথা বলছিলেন।

সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে ছাপানো জিয়ার নির্বাচনি পোস্টারে পুরো দেশ ছেয়ে যায়। সরকারি গণমাধ্যমে ঢাকঢোল পিটিয়ে তার নির্বাচনি সমাবেশের খবর প্রচারিত হয়। এমনকি দেশের জেলা প্রশাসনগুলো নিজেরাই জিয়ার সমাবেশের লিফলেট ছাপিয়ে জনগণের মধ্যে বিতরণের দায়িত্ব নিয়েছিল। ওসমানী অভিযোগ করেন গণমাধ্যমে তার বক্তব্য বিকৃতভাবে প্রচার হচ্ছে। এমনকি সরকার নিয়ন্ত্রিত পত্রিকায় তাকে নিয়ে একের পর এক ভিত্তিহীন রিপোর্ট প্রকাশিত হতে থাকে।

জেনারেল জিয়ার রাজনৈতিক দল বিএনপি সম্পর্কে পাকিস্তানের দি হেরাল্ড পত্রিকায় বলা হয়, ‘বিএনপির জন্ম ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার নীলনকশার ফলে।… এই দলের জন্য যে দর্শন নির্ধারণ করা হয় তা হলো: আওয়ামী লীগের দুর্বল স্থানে আঘাত করা এবং জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব জাগ্রত করা।… নিন্দিত আওয়ামী লীগার, চরম বামপন্থী ও মুসলিমলীগারদের নিয়ে দলের জনবল বাড়ানো হয়।’এর আগে, ১৯৭৭ সালে এপ্রিল মাসে প্রেসিডেন্ট আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে ক্ষমতাচ্যুত করে, অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। এরপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে একটি হ্যাঁ-না ভোটের আয়োজন করেন তিনি।

১৯৭৭ সালের লোক দেখানো সেই ভোটের আগে, বিক্ষোভের ভয়ে, রাস্তায় কোনো মানুষকে পর্যন্ত বের হতে দেওয়া হয়নি। এমনকি কোনো প্রচারণাও করা হয়নি। ভোটের দুদিন আগে সড়কের পাশের দেয়ালে, চলমান রিকশা-বাস ও মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি থামিয়ে জোড় করে জেনারেল জিয়ার সামরিক পোশাক পরিহিত পোস্টার সাঁটিয়ে দেওয়া হয়। এক ধরনের আতঙ্ক ছড়ানো হয় মানুষের মধ্যে। ভোটের দিন ভয়ে কেউ বের হওয়ার সাহস পায়নি। ফলে ভোটারবিহীন থেকে যায় ভোটকেন্দ্রগুলো। এক পর্যায়ে মানুষ খুঁজে না পেয়ে, শেষ পর্যন্ত স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীকে ভোট দিতে নিয়ে যাওয়া হয়। দিন শেষে ঘোষণা আসে, ৯৯.৪ ভাগ ভোট পেয়ে একচেটিয়াভাবে জয় লাভ করেছেন জেনারেল জিয়া।

ভোটারবিহীন নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের শতভাগ ভোটের বিজয় এবং স্বৈরাচারী শাসন চালুর ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রুদ্ধ করে দেওয়ার জন্য, মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি প্রচলনের জন্য, জাতির কাছে জিয়াউর রহমান মীরজাফরের সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে। জিয়াউর রহমানের দেখানো পথে ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি, খালেদা জিয়াও জনগণকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে এক ভোটারবিহীন নির্বাচন আয়োজন করেন। কোনো দল ওই সাজানো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায়, নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে কুমিল্লা-৬ আসন থেকে জিতিয়ে আনেন বঙ্গবন্ধুর খুনি ও ফ্রিডম পার্টির আবদুর রশিদকে।

জিয়াউর রহমান প্রথমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এরপর নিজের ক্ষমতা সুসংহত করতে ধ্বংস করে দিয়েছেন দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা। হ্যাঁ-না ভোট নামের একটি তামাশার প্রচলন ঘটিয়েছেন। এমনকি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে হত্যা করে, ভোটারবিহীন ভোটের প্রবর্তকও তিনি। জিয়াউর রহমানের অবৈধ ক্ষমতার মোহের কারণেই স্বৈরাচারী ব্যবস্থাপনায় পতিত হয় বাংলাদেশ। ফলে উগ্রবাদের বিস্তার ঘটে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে ১৯৭২ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় রাজনীতিতে ফিরে আসার নীতির কারণে ধর্মভিত্তিক দলগুলো সুযোগ পায়। এর ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীও রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়।

১৯৭৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরিকল্পনা এমন ভাবে করা হয়েছিলো যেখানে জিয়াউর রহমান যেন সামরিক প্রেসিডেন্ট নন , বেসামরিক পোশাকে সামরিক প্রেসিডেন্ট হতে পারেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে জিয়াউর রহমান ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকেন জনগনের সমর্থন আদায়ের জন্যে। যদিও তার ক্ষমতার উৎস ছিল সামরিক বাহিনী কারণ তিনি একাধারে সামরিক বাহিনীর প্রধান ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর কমান্ডার ইন চীফ ছিলেন।

১৯৭৭ সালে তিনি শাসনতন্ত্রে কিছু পরিবর্তন আনেন নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে, যেখানে ছিলো ‘বিসমিল্লাহে-রাহমানুর-রাহিম’ সহ আরও কয়েকটি পরিবর্তন। এই সংশোধনীতে উল্লেখযোগ্য যে পরিবর্তনটি আনা হয় তা হলো বাংলাদেশের জনগনকে এখন থেকে ‘বাঙালি’ নয় ‘বাংলাদেশি’ বলা হবে। ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবর রহমান যখন তাঁর দেশবাসীকে বাঙালি হিসেবে উল্লেখ করেন তখন নয়া দিল্লীতে এই ব্যাপারে বেশ উদ্বেগ পরিলক্ষিত হয়। দিল্লীর কর্তা ব্যক্তিরা মনে করতেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রভাব তাদের পশ্চিম বাংলাতেও পড়বে এবং তার ফল খারাপ হতে পারে, যার কারণে জিয়াউর রহমানের সংশোধীত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ দিল্লীতে সমর্থন লাভ করে খুব সহজে।

১৯৭৮ সালের নির্বাচনে জয় লাভের জন্যে এই কার্যক্রমগুলো অনেক ফলপ্রসূ ছিল। তবে প্রেসিডেন্ট নির্বচনে নিশ্চিত জয় লাভের সম্ভাবনা থাকা সত্বেও জিয়াউর রহমানের পক্ষে কিছু কারচুপি ও কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়।সে সময় অভিযোগ ওঠে বিরোধীদলগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্যে মাত্র ৪০ দিনের নোটিশ এবং ২৩ দিনের প্রচারণার সুযোগ দেওয়া হয়। অন্যদিকে নিজের নির্বাচনি প্রচারণার জন্যে সরকারি প্রশাসনযন্ত্রকে পুরোপুরি কাজে লাগান তিনি। টিভি- রেডিও এবং সংবাদপত্রকেও বাধ্য করা হয় বিরোধীদলগুলোর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের জন্যে।

ভোটের আগে জিয়া চাইতেন , তার পক্ষে যেন শতকরা ৭০ ভাগ ভোট দেখানো হয়। তবে পরবর্তিতে নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন সত্যি কিন্তু তার এই প্রেসিডেন্ট হবার ব্যাপারটি অবৈধ বলে অভিযোগ ওঠে এবং এই অভিযোগের পেছনে এতই শক্তিশালী প্রমাণ ও তথ্য ছিলো যে তিনি এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করারই যোগ্য ছিলেন না।

জিয়া কর্তৃক ঘোষণাকৃত প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডিন্যান্স ১৯৭৮ অনুযায়ী :
সেই ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না 
(১) যদি তার বয়স ৩৫ এর কম হয় ,
(২) যদি তিনি এম.পি নির্বাচনের অযোগ্য হয়ে থাকেন ,
(৩) যদি সংবিধান অনুযায়ী তিনি প্রেসিডেন্ট পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে থাকেন ,
এমনকি সংবিধান অনুযায়ী সেই ব্যাক্তি প্রার্থী হতে পারবেন না, যিনি সরকারি চাকরি থেকে বেতন গ্রহণ করে থাকেন। অর্থাৎ সংবিধান অনুযায়ীও জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট প্রার্থীও হতে পারেন না কারণ ঐ সময়ে তিনি সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকে বেতন গ্রহণ করতেন।

জিয়াউর রহমান এই সব বাঁধা কাটিয়ে ওঠার জন্যে ২৯ এপ্রিল ১৯৭৮ সালে ত্রয়োদশতম সংশোধনী পাস করান।
(১) চিফ মার্শাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ হবেন এবং তিনি প্রত্যক্ষভাবে বা তার বাহিনী প্রাধনের মাধ্যমে এই সব বাহিনী নিয়ন্ত্রণ, নির্দেশনা ও পরিচালনা করবেন।
(২) চিফ মার্শাল এখন থেকে বেতনভোগী সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচিত হবে না।
কিন্তু ১৯৭৮ সালের ২ মে নমিনেশন জমা দেবার আগেও এমনকি নির্বাচনের দিন পর্যন্ত সরকারি কাগজপত্র অনুযায়ী তিনি চিফ অব আর্মি স্টাফ এর মত বেতনভুক্ত চাকরিতে বহাল ছিলেন এবং এইটা ছিলো সংবিধান অনুযায়ী নিয়ম বহির্ভূত এবং অবৈধ।

এছাড়া জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে অদ্ভুতভাবে কয়েকটি গেজেট নোটিফিকেশন ইস্যু করেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ সালে গেজেট নোটিফিকেশন নং ৭/৮/ডি-১/১৭৫-১৬০; অনুযায়ী তিনি নিজেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নীত করেন।

৯ই এপ্রিল ১৯৭৯ সালে গেজেট নোটিফিকেশন নং ৭/৮/ডি-১/১৭৫-২৭০; অনুযায়ী আগের নোটিফিকেশন বাতিল করে আবার নতুনভাবে নিজেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নীত করেন যা ২৮ এপ্রিল ১৯৭৯ সালে কার্যকর হবে।

আবার ৯ এপ্রিল ১৯৭৯ সালে অন্য একটি নোটিফিকেশন নং ৭/৮/ডি-১/১৭৫-২৭১; অনুযায়ী তিনি নিজেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদ থেকে অবসর গ্রহণ করান , যা কার্যকর হবে ২৯-৪-১৯৭৮ সালে । এই সব বে-আইনি কার্যকলাপের কোন সুস্পস্ট ধারনা না পাওয়া গেলেও কারও বুঝতে বাকি থাকে না যে তিনি কি চাইছিলেন?

ধারণা করা হয় এই সব কার্যকলাপের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান এমন অবস্থার সৃষ্টি করতে চান, যাতে তিনি সারা জীবন প্রেসিডেন্ট পদে বহাল থাকতে পারেন। আর এভাবেই তিনি তার অবস্থান রাজনীতিতে পোক্ত করতে চেয়েছিলেন। যদিও পরবর্তিতে খোন্দকার মোশতাক বলেছিলেন- জিয়াউর রহমানের গণতন্ত্র একনায়কতন্ত্রের চেয়েও ভয়ংকর ছিলো। এভাবেই দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছিল ১৯৭৮ সালের ৩ জুন। আর ইতিহাসবিদদের মতে বর্তমান প্রজন্মের এই দিনটির পূর্বাপর ঘটনা জানা জরুরি।

লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) ও বার্তা সম্পাদক, দৈনিক বাংলাদেশ বুলেটিন

 

এ জাতীয় আরো খবর

যানজট সমস্যা ও প্রতিকার : একটি পর্যালোচনা

যানজট সমস্যা ও প্রতিকার : একটি পর্যালোচনা

বাজেট ২০২১-২০২২ : জীবন ও জীবিকার চমৎকার সমন্বয়

বাজেট ২০২১-২০২২ : জীবন ও জীবিকার চমৎকার সমন্বয়

মানবহিতৈষী এক উপাচার্যের কথা

মানবহিতৈষী এক উপাচার্যের কথা

প্রজন্মের চেতনার বলয় বিনির্মাণে বঙ্গবন্ধু

প্রজন্মের চেতনার বলয় বিনির্মাণে বঙ্গবন্ধু

ভ্যাকসিন উৎপাদন ও প্রয়োগের নিশ্চিতকরণ জরুরি

ভ্যাকসিন উৎপাদন ও প্রয়োগের নিশ্চিতকরণ জরুরি

বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস : শিশুবান্ধব নিরাপদ পৃথিবী চাই

বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস : শিশুবান্ধব নিরাপদ পৃথিবী চাই