ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

চট্টগ্রাম নগর জুড়ে বিজ্ঞাপন : কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি

কামরুজ্জামান রনি, চট্টগ্রাম :

২০২১-০৬-২২ ১৭:১২:৫৮ /

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) এলাকায় বিজ্ঞাপন বিলবোর্ড মুক্ত রাখতে এসবের অনুমোতি দেয়া হচ্ছেনা আজ অনেক বছর। কিন্তু শহর জুড়ে ভিন্ন কৌশলে নানান রুপে ঠিকই বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হচ্ছে। ফলে এই খাত থেকে চসিক কোন রাজস্ব না পেলেও চসিকের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে দেশের খ্যাতনামা অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান ও বিজ্ঞাপনি সংস্থাগুলো। 

বিগত চসিক মেয়রের সময় ২০১৬ সালের ১৪ জানুয়ারি থেকে ক্রাশ প্রোগ্রামের আওতায় নগরী থেকে হাজারো বিলবোর্ড আর ইউনি পোল উচ্ছেদ করা হয়। সেই সাথে কোন প্রকার অবকাঠামো তৈরি করে বিজ্ঞাপন প্রদর্শন তথা বিলবোর্ড, ইউনি পোল স্থাপনে অনুমোদন দেয়া বন্ধ করে দেয় চসিক।

আগে প্রতি বর্গফুট বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের জন্য ৮০ টাকা করে রাজস্ব পেতো চসিক। তবে কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের চেয়ে শহরের সৌন্দর্য্য রক্ষাকে প্রাধান্য দেয়ায় বেশ সুনামও কুড়িয়েছিলেন তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। তবে সৌন্দর্য্য বর্ধনের চুক্তিতে কিছু কিছু সড়ক বিভাজন, চত্ত্বর আর আইল্যান্ডে দোকান নির্মাণ আর বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের সুযোগ দিয়ে বিতর্কেরও জন্ম দিয়ে গেছেন তিনি।

চট্টগ্রাম শহরে বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমোদন না থাকলেও শহরজুড়ে বিশালাকার বিজ্ঞাপনগুলো ঠিকই প্রদর্শিত হচ্ছে। আগে ভবনের ছাদে বিলবোর্ড স্থাপন করা হতো। এখন কৌশল পাল্টে বহুতল ভবনের গায়ে পিভিসি প্রিন্ট করা ডিজিটাল বিজ্ঞাপন লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে। যেগুলোর নূন্যতম উচ্চতা ২০ থেকে ২৫ ফুট।

আবার অনেক বহুতল ভবনকে বিজ্ঞাপন দিয়ে পেইন্ট করে দেয়া হচ্ছে। নগরীর বিভিন্ন প্রধান সড়কের আশে পাশের ২ থেকে ৬,৭ তলা ভবনের বাহিরের পুরো দেয়ালজুড়ে বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন মুড়ে দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ভবন মালিকদের সাথে বাৎসরিক ভাড়ার চুক্তিতে এসব বিজ্ঞাপন লাগানো হলেও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব বিভাগ জানিয়েছে এই খাতে তাদের আয়ের হিসেব কয়েক বছর যাবৎই শূন্য৷ 

বিগত ৭ দিন যাবৎ নগরীর বিভিন্ন শহর, অলি গলি ঘুরে এই প্রতিবেদকের চোখে বিভিন্ন ভবনের দেয়ালে নামিদামি প্রতিষ্ঠানের শত শত বিজ্ঞাপনের দেখা মিলেছে। এসকল বিজ্ঞাপনের বেশিরভাগই প্রাণ আরএফএল গ্রুপের প্লাস্টিক, বেভারেজ আর ভোগ্যপণ্যের দখলে। একই সাথে পাল্লা দিয়ে ভবনের দেয়ালজুড়ে বিজ্ঞাপন লাগিয়েছে এন মোহাম্মদ প্লাস্টিক, জিপিএইচ ইস্পাত, প্রিমিয়ার সিমেন্ট, পার্টেক্স বোর্ড, পার্টেক্স ক্যাবল, গোল্ডেন ইস্পাত, সজিব কর্পোরেশনের মত প্রতিষ্ঠাগুলো। 

এসব রাজস্ব ফাঁকি দেয়া বিজ্ঞাপনের বিষয় দেখাশোনা করার জন্য প্রাণ আরএফএল গ্রুপের চট্টগ্রামের ইনচার্জ হয়ে কাজ করছে মোঃ মাসুদ। এই বিষয়ে তার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, বিজ্ঞাপনের রাজস্ব চসিককে দেয়া হয় কিনা সেটা তিনি জানেন না। চসিক এলাকায় যে কোন বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের জন্য প্রতিবর্গফুটে ৮০ টাকা করে রাজস্ব দিতে হয়। প্রাণ আরএফএল গ্রুপের মত প্রতিষ্ঠান তাদের অন্তত ১০ হাজার বর্গফুট এমন বিজ্ঞাপন লাগিয়েছে মর্মে তথ্য পাওয়া গেছে। অথচ চসিক রাজস্ব বিভাগ বলছে তারা আজ পর্যন্ত এককানা কড়িও রাজস্ব জমা দেয়নি। এই বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রশ্ন করলে প্রাণ আরএফএল গ্রুপের দ্বায়িত্বশীল কর্মকর্তা মাসুদ কোন বক্তব্য দিতে রাজি হননি। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে সজীব কর্পোরেশনের সেজান জুস, ম্যাকারনি সহ বিভিন্ন ব্রান্ডের বিজ্ঞাপন প্রচারণার কাজ করছে মেসার্স আর এস পাবলিসিটি। এই বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার এম এ রউফের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি চট্টগ্রাম নগরীতে সজীব কর্পোরেশনের বিজ্ঞাপন লাগানোর কথা স্বীকার করেন। এই সংক্রান্ত কোন অনুমতি চসিক থেকে নেয়া হয়েছে কিনা প্রশ্ন করলে তিনি মৌখিক ভাবে অনুমতি নেয়া হয়েছে বলে জানান। কে বা কাদের কাছ থেকে মৌখিক অনুমতি নিয়েছেন প্রশ্নের জবাবে তিনি চসিকের রাজস্ব বিভাগের রুপন বাবুর নাম জানান। অনুমতি না নিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে এমন বিজ্ঞাপন লাগানো তাদের উচিত হয়নি বলেও স্বীকার করে নেন এম এ রউফ। 

একইভাবে এন মোহাম্মদ প্লাস্টিকের হয়ে বহুতল ভবনজুড়ে বিজ্ঞাপনের কাজ করছে সাইনকম নামক একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের মালিক মোঃ বাবরের সাথে যোগাযোগ করলে প্রথমে তিনি এন মোহাম্মদ প্লাস্টিকের বিজ্ঞাপনের কাজের বিষয়টি স্বীকার করেনি। পরে প্রতিনিধির কাছে থাকা তথ্যের সূত্রে পাল্টা প্রশ্ন করলে তিনি কাজগুলো একাধিক প্রতিষ্ঠানকে সাব-কন্ট্রাকে দেয়া হয়েছে বলে জানান। তবে কোন কোন প্রতিষ্ঠান কাজ করেছে আর চসিকের অনুমতি আর রাজস্বের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানাতে পারেনি।

নগরীর বহুতল ভবনগুলো ছাড়াও সড়কের পাশের দেয়ালগুলোতে আঁকা হচ্ছে বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন। এসবের তালিকায় শীর্ষে আছে এসকিউ কেবল ও বৈদ্যুতিক সামগ্রী, মদিনা ট্যাংক, মদিনা, পানির পাম্প, মদিনা কিচেন সিংক, শীতলপুর অটো স্টিল মিলসের এসএএসএম রড, রুপচাঁদা সয়াবিন তেলসহ অনেক প্রতিষ্ঠান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই কাজে জড়িত একাধিক ব্যক্তি চসিক’র রাজস্ব শাখার একজন ব্যক্তির নাম এই প্রতিবেদকের কাছে প্রকাশ করেন। আর সেই আলোচিত ব্যক্তিটি হলেন উপ কর কর্মকর্তা রুপন কান্তি চৌধুরী। যিনি দীর্ঘদিন যাবৎ চসিক’র রাজস্ব শাখায় কাজ করছেন। তবে সবাই জানেন তিনিই এসব বিলবোর্ড বা বিজ্ঞাপনের বিষয়ে অভিজ্ঞ।

এই বিষয়ে বাংলাদেশ বুলেটিন মুখোমুখি হয় চসিক’র প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার। এই প্রতিবেদকের কাছ থেকে এ সংক্রান্ত তথ্য জানতে পেরে তিনি নিজেও বিষ্ময় প্রকাশ করেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে তাৎক্ষণিক রুপন বাবুকে ডেকে এনে এসব বিজ্ঞাপনের বিষয়ে জানতে চান। এই প্রতিবেদকের সামনেই রুপন বাবু পুরো বিষয়টি চসিক মেয়র রেজাউল করিমের ওপর চাপিয়ে দেন।

রুপন বাবু বলেন, আমি স্যারকে (চসিক মেয়র) বহুবার এসব বিজ্ঞাপনের অনুমোদনের কথা জানালেও স্যার কোন বিজ্ঞাপনে অনুমতি দেয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন। এসময় প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোঃ নজরুল ইসলাম জানতে চান যদি অনুমতি না-ই থাকে তাহলে এসব বিজ্ঞাপন উচ্ছেদ করা হচ্ছেনা কেন? এই প্রশ্নের জবাবে রুপন বলেন, তাহলে খোঁজ নিতে হবে কোথাই কোথাই বিজ্ঞাপন আছে। এসময় প্রতিবেদক জানান, চসিক অফিস থেকে বের হয়ে হাতের ডানে-বায়ের সব দেয়ালেইতো বিজ্ঞাপন এগুলোও কি আপনার চোখে পড়েনি। এসময় তিনি বিষয়গুলো ৮টি রাজস্ব সার্কেল দেখার অনুজাত তুলে ধরেন। 

পরে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানের সাথে রুপন বাবু ব্যক্তিগত সু-সম্পর্কের বিষয়ে জানতে তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বিজ্ঞাপনে কাজ করে সবাই আমাকে চেনে। তারা বিজ্ঞাপন লাগানোর অনুমতির বিষয়ে আমার কাছে জানতে চাইলে আমি বলেদেই চসিক মেয়র কোন অনুমতি দেয়া বন্ধ রেখেছে।” তাদেরকে বিজ্ঞাপন লাগাতে নিষেধ করেননি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন “আমি তাদের বলেছি কিন্তু তারা কথা শুনে না।” বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে মোটা অংকের মাসোহারা পাওয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। 

যে কোন স্থাপনায় সাইনবোর্ড প্রদর্শনের জন্যে চসিককে রাজস্ব দেয়া বাধ্যতামূলক। সেক্ষেত্রে ব্যবসায়িক ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ ও রিনিউ করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সম্মুখে সাইনবোর্ড প্রদর্শনের জন্য নির্ধারিত ফি আদায় করে থাকে চসিক। নগরীর চসিক’র ৮টি রাজস্ব সার্কেল এসব ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন করে থাকে।

একাধিক সূত্র বলছে যে পরিমাণ বিজ্ঞাপন নগরীতে লাগানো আছে তা থেকে নূন্যতম ৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হওয়ার কথা। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো এবং বিজ্ঞাপনি সংস্থাগুলো চসিক'র অসাধু চক্রকে ম্যানেজ করে পুরো রাজস্বই ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ ২০২০ সালের মে মাসে চসিক এ স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট (যুগ্ম জেলা জজ) জাহানারা ফেরদৌস এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আফিয়া আখতারের নেতৃত্বে এক অভিযানে অবৈধভাবে ভবনের দেয়ালে বিলবোর্ড স্থাপন করায় নগরীর জাকির হোসেন রোড খুলশী ১ নম্বর সড়কের প্রবেশমুখে আবুল হোসেন নামের এক ভবন মালিককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিলো।

এই বিষয়ে শীঘ্রই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানালেন চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোঃ নজরুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন, সৌন্দর্য্য বর্ধন চুক্তির বাহিরে কোন বিজ্ঞাপন বিলবোর্ড লাগানোর অনুমতি নেই। নগরীতে সাময়িক ব্যানার, ফেস্টুন লাগানোর জন্যেও চসিক থেকে নির্ধারিত ফি দিয়ে অনুমতি নিতে হয় যা মেয়াদ শেষে চসিক খুলে ফেলে। আর সেগুলোর বিষয় এখন জানলাম শীঘ্রই তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বাবু/প্রিন্স

এ জাতীয় আরো খবর

এখনও হাসপাতালবিহীন উপজেলা ‘রাঙ্গাবালী’!

এখনও হাসপাতালবিহীন উপজেলা ‘রাঙ্গাবালী’!

স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে আরও একধাপ এগিয়ে গেলো নিউজিল্যান্ড

স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে আরও একধাপ এগিয়ে গেলো নিউজিল্যান্ড

চট্টগ্রামে চাঁদার টাকাসহ র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার ৫

চট্টগ্রামে চাঁদার টাকাসহ র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার ৫

পরী-সাকলায়েনের ভিডিও ভাইরাল (ভিডিও)

পরী-সাকলায়েনের ভিডিও ভাইরাল (ভিডিও)

নগরীতে বেপরোয়া ব্যাটারি চালিত রিকশা; হরহামেশাই ঘটছে দুর্ঘটনা

নগরীতে বেপরোয়া ব্যাটারি চালিত রিকশা; হরহামেশাই ঘটছে দুর্ঘটনা

মুনিয়া হত্যায় নতুন মোড়; অভিযোগকারীই এখন অভিযুক্ত

মুনিয়া হত্যায় নতুন মোড়; অভিযোগকারীই এখন অভিযুক্ত