ঢাকা, শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১ ই-পেপার

তালেবানী ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ : আফগানবাসীর নাগরিক অধিকার

অধ্যক্ষ আকমল হোসেন

২০২১-০৭-১৬ ১৮:৩৭:৫৮ /

সম্প্রতি আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের পেক্ষাপটে মধ্যযুগীয় তালেবান গোষ্ঠী নতুন আমেজ নিয়ে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের অংশ হিসেবে নতুন করে অস্ত্রে শান দেওয়া শুরু করেছে। এমনতর অবস্থায় এশিয়ার এই দেশটিতে নতুন করে মানুষহত্যা পাল্টা হত্যার আশঙ্কা করছে জগৎবাসী। এমনতর আশঙ্কা এবং তা দূর করার প্রত্যাশা থেকে এই লেখার প্রয়াস।

মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মে কিন্তু সে সর্বত্রই শৃঙ্খলিত। এই শৃঙ্খল পরিয়েছে ক্ষমতাধর ব্যক্তি, সমাজ অধিপতি এবং রাষ্ট্র নামক যন্ত্র। শৃঙ্খল যারা পরিয়েছে তারা সংখ্যায় কম তবে ক্ষমতা তাদের বেশি। ব্যক্তিগোষ্ঠীর রাজনৈতিকও সামাজিক স্বার্থে নানাভাবে নানা অযুহাতে এদেরকে সচেতন না করে অন্ধ করে রেখেছে। ধর্মীয় মোড়ল সামাজিক অধিপতি এবং রাজনীতিকরা। এই কাজটা জগতের শুরু থেকে শুরু করেছে, আজও সেটার লাগাম ছাড়েনি। শুধু কর্তৃত্ব করার পদ্ধতিটি পাল্টিয়েছে। তথাকথিত সেই বিধানগুলো আইনী স্বীকৃতির জন্য রাষ্টীয় অনুমোদনের ব্যবস্থা করেছে। তা কার্যকর করার জন্য রাষ্টীয় বিভিন্ন বাহিনীকে কাজে লাগিয়েছে। ফেসবুকে মন্তব্যের জন্য সাধারণ মানুষকে জেলের ভাত খেতে হলেও সুন্দরী নাবালিকাকে বিয়ে, তালাক এবং হত্যার দিকে ঠেলে দিলেও থানা তো দূরে থাক কোটের বারান্দায়ও অনেককে যেতে হয়না। কেবলই অর্থবিত্ত আর রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণকারীদের সাথে সখ্যতা থাকার জন্য। মনীষী বাট্রান্ড রাসেল সেই কারণেই হতো বলে ছিলেন রাষ্ট্রযন্ত্র জনগণের বিপক্ষে গেলে সেই রাষ্ট্রে মানুষ বাস করতে পারেনা। বাট্রান্ড রাসেলের সেই উক্তি আজ পৃথিবীর অনেক দেশে বাস্তবতা হিসেবে দৃশ্যমান। এই বিষয়টার বেশি মুখোমুখি আফগানিস্তান। একদিকে মৌলবাদী জঙ্গি তালেবান অন্য দিকে মুনাফা লোভি সাম্রাজ্রবাদী আমেরিকাসহ তার স্বার্থরক্ষাকারী পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ। তাদের লাভ-লোকসানের হিসেবের চক্রান্তে আফগান নাগরিকের সুখ-শান্তি আর স্বাধীনতা কি জিনিস সেটার স্বাদ তারা পায়নি। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি মানবতা আর স্বাধীন চিন্তা কি তারা জানে না। কিন্তু এটাতো হওয়ার কথা ছিলো না। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ইরান পাকিস্তান আর চীনের সীমান্ত ঘেঁষে এশিয়ার একমাত্র দেশ আফগানিস্তান।

১৮ শতাব্দীতে সামন্ততান্ত্রিক আফগান রাষ্ট্রের পত্তন ঘটে। ১৯ ও ২০ শতব্দীতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বৃটিশ সাম্রাজ্রবাদের প্রভাবান্বিত ছিলো। সোভিয়েত ইউনিয়নই একমাত্র দেশ যে, প্রথম আফগানিস্তানকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলো। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে রাজতন্ত্র বিদ্যমান ছিলো। রাজতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে বামপন্থিদের গড়ে তোলা রাজনৈতিক দল জনগণতান্ত্রিক পার্টির নেতৃত্বে আফগানিস্তানে রাষ্টীয় ক্ষমতায় আসীন হয়েছিলো। আধুনিক রাষ্ট্র গড়তে প্রগতিশীলতার চর্চা নারী স্বাধীনতা সবার জন্য লেখাপড়ার ব্যবস্থাসহ নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ার কার্যক্রম শুরু করছিলো। বিংশ শতাব্দীর শুরুতই রাশিয়া চীন মঙ্গোলিয়া ভিয়েতনামসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ায় সাম্রাজ্য হারানোর আতংকে ছিলো আমেরিকা ন্যাটো ও তার মিত্র দেশগুলো। এশিয়ার বৃহৎ দেশ চীন, ভিয়েতনাম উত্তর কোরিয়া মঙ্গোলিয়াতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংগটিত হওয়া, ভারতের বেশ  কয়েকটি রাজ্যে বামপন্থিদের শক্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় আতংকিত ছিলো আমেরিকা। তাই নতুনভাবে এ অঞ্চলে আর কোনো সমাজতান্ত্রিক দেশের জন্ম হোক এমনটা যেমন চাচ্ছিলো না। তেমনি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বাড়ুক এটা তারা সহ্য করতে পারছিলো না। আমেরিকার এই না চাওয়া থেকে আফগানিস্তানের মানুষের যে শনির দশা শুরু হয়েছিলো সেটা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবকে দুর্বল করতে এবং বামপন্থিদের সরকারকে উৎখাত করতে আমেরিকা, ইরান, সৌদি আরব এবং পাকিস্তান মিলে আল-কায়দা মুসলিম জঙ্গিগোষ্ঠী গড়ে তোলে। এই কাজ করতে তারা অর্থ ও অস্ত্রের সরবরাহ প্রদান করে। হামিদ কারজাইও তখন মোলবাদীদের একটা গ্রুপের প্রধান হিসেবে সিগবাতুল্লাহ মুজাহিদীনের অফিস পরিচালনা করতেন। ১৯৭৯ সাল থেকে সৌদি আরব ও আমেরিকা মিলে প্রতিবছর আফগান মৌলবাদীদের ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করতো। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র ও অর্থ পেতো গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার এর গ্রুপ। সেই সময় গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার ৬০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থ ও অস্ত্র পেয়েছিলো।পশতুন সম্প্রদায়ের মধ্যে উগ্র মৌলবাদী গ্রুপ সৃষ্টি করতে জালাল উদ্দিন হক্কানী প্রচুর পরিমাণ অর্থ ও অস্ত্র নিয়েছিলো। জঙ্গি এই গোষ্ঠী সাম্রাজ্যবাদীদের টাকায় জীবন অতিবাহিত করেছে। ১৯৮৫ সালের পরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মৌলবাদী মানসিকতার মানুষ সংগ্রহ করে  জিহাদের নামে জঙ্গি প্রশিক্ষণ প্রদান করা হতো। প্রশিক্ষিত এই জঙ্গিগোষ্ঠীর নাম দিয়েছিলো আফগান আরব। সৌদি ওসামা বিন লাদেন ঐ গ্রুপের একজন ছিলেন। সৌদি আরব পাকিস্তান আর আমেকিার তত্ত্বাবধানে সৃষ্ট আল কায়দা। সবার ঐক্যবদ্ধ ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা পেতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা  নজিবুল্লাহর সরকার সোভিয়েত বাহিনীকে আফগানিস্তানে প্রবেশের অনুমতি দেয়। ১৯৮৮ সালে আফগানিস্তান থেকে রুশ সৈন্য অপসারণ করা হয়। এরপর নজিবুল্লাহর সরকারের পতন হলে তালেবানরা ক্ষমতা দখল করে এবং মধ্যযুগীয় শাসন শুরু করে। নারীদের বাইরে যাতায়াত ও স্কুল কলেজে যাওয়া নিষিদ্ধ করে, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ভেঙে গুড়িয়ে দেয়। পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে তালেবানরা। বিদ্রোহী হয়ে ওঠে আফগান জনতা, একপর্যায়ে তালেবানরা ক্ষমতা হারায়। হামিদ কারজাই মার্কিন বাহিনীর সমর্থন নিয়ে ক্ষমতা দখল করে।

’৮০ দশক থেকে সেখানে কওমি মাদ্রাসা গড়ে তোলা হয়, জাতিসংঘের তত্ত্ববধানে চারটি নির্বাচনও হয়। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা আর ঘোড়া মানুসিকতার কারণে খুব বেশি মানুষকে কুসংস্কারমুক্ত কর সম্ভব হয়নি। আপগানিস্তানের সাধারণ মানুষ মার্কিন বা জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের বিশ্বাস করেনি। কারণ আফগান প্রশাসনও নানা দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে পরেছিলো। মার্কিন বাহিনীর অনেক সমরবিদ গোপনে তালেবানদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিযেছে এমন অভিযোগও আছে। ২০০৮ সাল থেকে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ওলামাদের সমাবেশ ও সম্মেলন করে তাদের নছিহত করে আফগান পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কাজ হয়নি কারণ সাপ আর মৌলবাদী পোষ মানে না। মার্কিনীরা আফগানদের তাদের জীবনযাত্রার আঙ্গিকে গড়ে তোলার জন্য যত চেষ্টা করেছে, সেই তুলনায় সুশাসন আর ন্যায়ের সমাজ গড়ার কাজটি করতে পারেনি অথবা করেনি। ফলে একনাগারে ২০ বছর আফগানিস্তানে অবস্থান করেও না পেরেছে তাদের মতে করে গড়ে তুলতে, না পেরেছে শান্তির পক্ষে দাঁড় করাতে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে আমেরিকার টুইন টাওয়ারে হামলার জন্য ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করে আমেরিকা আফগানিস্তানে সৈন্য প্রেরণ করে ওসামা বিন লাদেনকে গ্রেপ্তারের জন্য। সেই থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আফগানিস্তানে অবস্থান শেষে আফগানিস্তান ত্যাগের ঘোষণা দেয়। ২০ বছর ধরে আমেরিকার ৪ জন রাষ্ট্রপতির তত্ত্বাবধানে যুদ্ধ করে ২৩ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করেছে। কিন্তু শেষে পরাজয়ের গ্লানি নিয়েই বিদায় নিতে হলো- এর চেয়ে আরো করুণ পরাজয় বরণ করতে হয়েছিলো। ১৯৭৩ সালে আজকের সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনামের  সাথে ১৮ বছর ৯ মাসে যুদ্ধের পর । তাদের ৫ জন রাষ্ট্রপতির তত্ত্বাবধানে যুদ্ধ করতে যেয়ে ৫৯ হাজার সৈন্য হারাতে হয়েছিলো। মার্কিন সৈন্যের বিদায়ের সাথে সাথে আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চল তালেবানদের দক্ষলের খবর শোনা যাচ্ছে, তাতে তালেবানদের মধ্যযুগীয় শাসনকে প্রতিরোধ করতে স্থানীয় বিভিন্ন সশস্ত্র মিলিশিয়া গ্রুপ আফগান সরকারের প্রতি সংহতি জনিয়ে অস্ত্রধারণের ঘোষণা দিয়েছে। আফগান সরকারের বিমানবাহিনীর হামলাতেও তালেবানরা কোথাও কোথাও দুর্বল হয়ে পরছে। তবে হামলা-পাল্টা হামলার মাধ্যমে আফগানিস্তানে শান্তি ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। পার্শবর্তী দেশগুলো তালেবানদের আপাতত অনেকটাই সহনুভূতিশীল বলে মনে হচ্চে আর সেটা তাদের ব্যবসায়ী স্বার্থে এবং মার্কিন বিদ্বেষ মনোভাব থেকে। বিষয়টি ব্যবসায়ী মনোভাব দিয়ে বিবেচনা না করে আফগানিস্তানের সাধারণ নিরীহ নারী-পুরুষের আত্নমর্যাদার জায়গা থেকে বিবেচনা করলে এই মানুষগুলো অসভ্য একটি পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে পারে। পৃথিীবী কলঙ্কমুক্ত হতে পারে তালেবানী মধ্যযুগীয় অবস্থা থেকে পৃথিবীর শান্তিকামী প্রগতিশীল মানুষদের এটাই প্রত্যাশা হওয়া উচিত। পার্শ্ববর্তী দেশ রাশিয়া, সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং ইরান সেই দয়িত্বটাই পালন করা দরকার। আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ যেন আর সাম্রাজ্যবাদী ও তালেবানী মৌলবাদীদের বলির পাঠায় পরিণত না হয় সে বিষয়টা ভাবার সময় এসেছে। কারণ তালেবান জিতলে মানবতা হারবে, ঐ অঞ্চল থেকে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটবে না, বিষয়টি বিবেচনা করে জাতিসংঘের তত্তাবধানে শান্তির মিশন নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন।  সেক্ষেত্রে আফগান সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, কেন্দ্রীয় কমিটি এবং সিন্ডিকেট সদস্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

 

এ জাতীয় আরো খবর

দুর্যোগকালে  নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা

দুর্যোগকালে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা

শতবর্ষেও বঙ্গবন্ধু স্বমহিমায় ভাস্বর

শতবর্ষেও বঙ্গবন্ধু স্বমহিমায় ভাস্বর

সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্মদিন : একান্নে একান্ন যুক্ত হোক

সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্মদিন : একান্নে একান্ন যুক্ত হোক

আফগানিস্তান : জয়-পরাজয়ের সমীকরণ

আফগানিস্তান : জয়-পরাজয়ের সমীকরণ

 তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নপূরণের প্ল্যাটফর্ম সজীব ওয়াজেদ জয়

তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নপূরণের প্ল্যাটফর্ম সজীব ওয়াজেদ জয়

শুভ জন্মদিন তথ্যপ্রযুক্তির বরপুত্র সজিব ওয়াজেদ জয়

শুভ জন্মদিন তথ্যপ্রযুক্তির বরপুত্র সজিব ওয়াজেদ জয়