ঢাকা, শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১ ই-পেপার

মার্ক্সবাদ ও আমাদের প্রচলিত বিশ্বাস

শায়েখ আরেফিন

২০২১-০৭-১৯ ১৬:০৮:৪১ /

মার্ক্সবাদের সাথে ধর্মের বৈরিতা চূড়ান্ত। মার্ক্সের তত্ত্ব বলে সাম্যের কথা, শ্রেণিশত্রু নিধনের কথা; অন্যদিকে ধর্ম তৈরি করে শ্রেণিবৈষম্য, লালন করে অসাম্য। কার্ল মার্ক্স ধর্মকে তুলনা করেছেন আফিমের সাথে। মানুষের তৈরি মতবাদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী মার্ক্সবাদ আর মার্ক্সবাদের চেয়ে প্রভাবশালী মতবাদগুলো হচ্ছে ধর্মমত যা অতীন্দ্রিয়, এবং আকাশ থেকে নেমেছে বলে বহু মানুষের বিশ্বাস। সাম্যের মার্ক্সবাদ রাষ্ট্রেরাষ্ট্রে শক্তি হারিয়ে ফেললেও অসাম্যের ধারক ধর্মগুলো অলৌকিকতা ও ঐতিহ্যিক আশ্রয়ে টিকে আছে দাপটের সাথে। আজ ধর্মীয় উৎসবেও চোখে পড়ছে এ-অসাম্য। মুসলমান সম্প্রদায়ের ঈদ উৎসবে দেখা যাচ্ছে বিত্তবানেরা ক্রয় করেছে বড় পশু, আর তাদের কৃপার অপেক্ষায় আছে বিত্তহীনেরা। বিত্তবানদের প্রতি ধর্মের নির্দেশ আছে দরিদ্রদের দান করতে। দান-দয়া-করুণার এ-নির্দেশকে ধর্ম ভেবেছে এক মহৎ কাজ। ধর্ম ধরেই নিয়েছে পৃথিবীতে চিরকাল টিকে থাকবে বা টিকিয়ে রাখতে হবে ধনী-দরিদ্রের অসাম্য। তাই ধর্ম দয়া-দান-করুণার নির্দেশ দিয়েছে, কিন্তু অসাম্য দূরীকরণে উদ্যোগী হয়নি। বিত্তবানদের প্রতি দান করার আহ্বান জানিয়ে ধর্ম মহৎ সেঁজেছে, কিন্তু দানগ্রহীতা দান গ্রহণ করার মাধ্যমে যে হেয়প্রতিপন্ন হয়, তার দায়ভারও নেয়নি। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ধর্ম মানুষ সম্পর্কে খুব নিচু ধারণা পোষণ করে। ধর্ম ধরেই নিয়েছে দরিদ্র আত্মসম্মানবোধহীন, সে ধনীর দয়া-দান গ্রহণ করতে মুখিয়ে থাকে। তাই ধর্ম দান করতে ধনীকে পূণ্য-স্বর্গ-মদ-মধুর লোভ দেখিয়ে উৎসাহী করে তুললেও দরিদ্রকে দান গ্রহণে উৎসাহিত করতে প্রয়োজন বোধ করেনি।

প্রতিটি রাষ্ট্রের আইন-শাসন-রীতি-সংস্কৃতিতে ধর্মের প্রভাব প্রবল। একটি শিশুর জন্মের পর ধর্মরীতি অনুসারে আজান দেওয়া, তাহনিক করা, নাম রাখা, খৎনা, আকিকা, উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি, ষষ্ঠীপুজো, বাপ্তাইজ (Baptise) নানাবিধ আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়। মৃত্যুর পর সৎকারও হয় ধর্মরীতি অনুসারে। আর জন্ম-মৃত্যুর মধ্যবর্তী সময়ে- জীবন নামের ঝলকটুকুতে- মানুষ থাকে ধর্মের ভয়ে তটস্থ ও লোভে আপ্লুত। জীবদ্দশায় প্রায় সব নিয়ম-অনুষ্ঠান-প্রথা-উৎসবে সে অনুসরণ করে ধর্মীয় কাঠামো- সম্পদের বণ্টন, বিবাহরীতি, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক প্রভৃতি। একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতেও প্রধানতম উৎসবগুলো ধর্মাশ্রয়ী বড়দিন, ঈদ, পুজো, বুদ্ধপূর্ণিমা। এর মধ্যে হিন্দু ও মুসলমানের সাংস্কৃতিক উৎসব আরো বেশি ধর্মনির্ভর। ধর্মের অংশ বাদ দিলে এ দু-সম্প্রদায়ের আনন্দ উৎসবের উপলক্ষ প্রায় নেই।

ঈদ অর্থ কী? বলা হয়ে থাকে, ঈদ অর্থ খুশি বা আনন্দ। কিন্তু অভিধানে দেখা যায়, ঈদ আরবি শব্দ যার অর্থ উৎসব বা উদযাপন। বাঙালি মুসলমান মনে করে ঈদের দিন তাদের খুব আনন্দ হয়, তাই ঈদ অর্থ করেছে ‘আনন্দ’। সে অর্থে পুজো অর্থ করা যায় আনন্দ, বড়দিন মানে আনন্দ, বুদ্ধপূর্ণিমা মানে আনন্দ, জন্মদিন মানে আনন্দ- এক কথায় যেকোনো উৎসব উদ্যাপনের অর্থ করা যেতে পারে আনন্দ। ইংরেজিতে একটি টার্ম রয়েছে Objective Correlative. এই টার্মটি প্রকাশ করে শব্দের ভাবগত উদ্দেশ্যমূলক অর্থ। যেমন, মীরজাফর বললে কারো নাম বোঝায় না, বোঝায় বিশ্বাসঘাতক। বাঙালি সমাজে মীরজাফর বিশ্বাসঘাতকের সমার্থক, মোবিল ইঞ্জিন লুব্রিক্যান্টের সমার্থক, হোন্ডা মোটরসাইকেলের সমার্থক। একইভাবে শাব্দিক অর্থ পেরিয়ে উদ্দেশ্যমূলক অর্থ প্রধান হয়ে ওঠায় ঈদের সমার্থক হয়েছে খুশি বা আনন্দ।

আবেগ উপভোগের স্বতস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশই আনন্দ। সহজাতভাবে মানুষ আনন্দের প্রকাশ ঘটায় নেচে-গেয়ে, হইচই করে, ঢাকের তালে, রঙতামাশা করে, পান করে কিংবা অন্য কোনো সরব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। যেমন, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে টানটান উত্তেজনার পর জিতে গেলে মানুষকে আনন্দ করতে দেখা যায়; চার-ছক্কায় করতালি আর চিৎকার দেয়, রাস্তায় বেরোয়, হইচই করে, নেচে-গেয়ে উদ্দামতায় আনন্দের প্রকাশ ঘটায়। লক্ষ্যনীয় যে, আনন্দ উদ্যাপন করতে কাউকে প্রার্থনায় বসতে দেখা যায় না। প্রকৃতই, আনন্দ কখনো প্রার্থনা বা ইবাদত নির্ভর হতে পারে না। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ধর্মের উৎসবগুলোতে, এমনকি বাঙালির বর্ষবরণ অনুষ্ঠানেও সহজাত ও স্বতস্ফূর্ত আনন্দ রয়েছে। কিন্তু ইসলামে এসব নিষিদ্ধ। ইসলামে সঙ্গীত-নৃত্য-ঢাক-বাজনা-পান-চিৎকার-কৌতুক-রঙতামাশার অনুমতি নেই। ইসলামের সবকিছু ইবাদত নির্ভর। ঈদও তাই। নামাজের মধ্যে খুঁজতে হয় আনন্দ। নামাজে নিশ্চল, একাগ্রচিত্তে প্রভুপানে মনোনিবেশ করতে হয়, নামাজ হলো ধ্যান। ধ্যানমগ্নতা আনন্দের বিষয় নয়, আনন্দে স্বতস্ফূর্ত কোলাহল আবশ্যক।

ঈদের দিনকে পর্যালোচনা করলে পাওয়া যায় দিনভর প্রভুস্তুতি আর স্থ’ূল খাবারের আধিক্য। ঈদগাহে নামাজ পড়তে যাওয়াকে বড় আনন্দের ব্যাপার বলে ধরে নেওয়া হয়। গানশোনা, সিনেমা দেখা, তাসখেলা, দাবাখেলা, ছবিতোলা- ন্যূনতম এই ঘরোয়া আনন্দগুলোরও অনুমতি ধর্মে নেই। সবকিছু নিষিদ্ধ এখানে। কঠিনভাবে আত্মদমন আর একাগ্র প্রার্থনায়ই খুঁজে পেতে হয় এ আনন্দ! ঈদুল আযহায় মুসলমানদের প্রধান আকর্ষণ স্রষ্টা সমীপে পশুহত্যা। দিনভর চলে এ আনন্দ! ছুরি-চাপাতি-রক্ত-ধস্তাধস্তি-ছুটোছুটি-গোঙানি-আর্তনাদ- সবকিছু আনন্দ প্রদায়ী শব্দ হয়ে টিকে থাকে মুসলমানের মনে! পশুহত্যার মাধ্যমে ঈশ্বরতুষ্টি একটি আদিম প্রথা, পাওয়া যায় অনেক ধর্মসংস্কৃতিতে। অনেক সংস্কৃতিতে পশুউৎসর্গ-প্রথা ম্রিয়মান হলেও আমাদের ধর্মে প্রবল উদ্দীপনার সাথে কাজটি করা হয়ে থাকে আজও।

পশু উৎসর্গের রীতি, পুজো-প্রার্থনার পদ্ধতি কেন ও কীভাবে মানুষের সংস্কৃতিতে এলো তা নৃতত্ত্ব ও দর্শনের আলোকে দেখলে রহস্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। প্রাচীনকালে জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রে পশুশিকার ও কৃষিজীবনের অসহায়তা এবং নানাবিধ দুর্যোগের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষের মনে পুঞ্জীভূত হয় অলৌকিক শক্তিতে আস্থা। কেননা তারা অনুভব করেছে অভিপ্রায় কখনো বাস্তবায়িত হয়, আবার কখনো বাস্তবায়নের পথে কোথায় যেন কী বাধা আসে, প্রত্যাশামতো সবকিছু ঘটে না।

কারণ-কার্য জ্ঞানের অভাবে এ-প্রাতিকূল্য ও আনুকূল্যের পেছনে তাই অদৃশ্য অরিশক্তি ও মিত্রশক্তি কল্পনা না করে সে পারেনি। অতপর অশুভ-অবাঞ্ছিত-অনিষ্টকর ঘটনা প্রতিকার-প্রতিরোধের লক্ষ্যে অরিশক্তিকে তুষ্ট করার প্রয়োজন মনে করেছে। তুষ্ট করার আবাহন মানসে মানুষ তখন বের করেছে নানা উপায়। মনের ভাব-ভাবনা বিনিময়ের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম ভাষা; ভাষা নেই বিধায় বাকপ্রতিবন্ধী মানুষের সাথে যেমন ইশারা-ইঙ্গিতে ভাবের আদান-প্রদান সংঘটিত হয়, তেমনি অরি ও মিত্রশক্তির বেলায়ও, ভাষা না থাকায়, ইশারা-ইঙ্গিত-প্রতীক ও বিচিত্র আনুষ্ঠানিক আবহে শ্রদ্ধা-ভক্তি-ভালোবাসা নিবেদন করতে থাকে মানুষ। সংলাপের ভাষার অভাবে ইঙ্গিত-প্রতীকের মাধ্যমে মানুষ জানাতে চেয়েছে তার প্রয়োজনের কথা এবং প্রকাশ করতে চেয়েছে তার বাসনা, বিনয় ও কৃতজ্ঞতা। এসব ইঙ্গিত-প্রতীকের একেকটি রূপ হচ্ছে পুজো, প্রার্থনা, নামাজ, উপবাস, পশুউৎসর্গ, স্তুতিসঙ্গীত, ভজন, কীর্তন এবং আরো অজস্র পদ্ধতি। বাকপ্রতিবন্ধীর ভাষা না থাকলেও তার মূর্ত অস্তিত্ব বর্তমান থাকায় ইঙ্গিতে প্রত্যুত্তর পাওয়া যায়। কিন্তু কাল্পনিক অরি ও মিত্রশক্তির ভাষাও নেই, তা দৃশ্যমানও নয়। তাই চিরকাল ধরে এখানে অব্যাহত রয়েছে একমুখী প্রবাহ; মানুষ শুধু নিবেদন করে গেছে, কোনো উত্তর আসেনি, কেনো ফল মেলেনি। 
আজ পশু উৎসর্গের দিনটি মহাসমারোহে পালন করছে মুসলমান সম্প্রদায়। ‘ত্যাগের মহিমা’ কথাটি বেশ প্রচারিত হয়। ত্যাগ কে করছে- মানুষ না পশু? আনন্দ কোথায়- নৃশংসতায় না মহাভোজে? অন্য ধর্মের উৎসবে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও অংশ নিতে পারে, উপভোগ করতে পারে। কিন্তু ইসলাম এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। ঈদগাহ, মসজিদসহ ‘পবিত্র’ অনেক স্থানে শুধু মুসলমানেরাই থাকবে, ওখানে অন্যদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। এমনকি মুসলমান নারীরাও মুক্তি পায়নি ধর্মের সংকীর্ণতা থেকে। রান্নাঘর আর খাবার টেবিল তাদের চলাচলের স্থান, অন্যদের খাওয়ানোতে তাদের ‘আনন্দ’ সীমাবদ্ধ। একটি ধাঁধা মনে পড়ছে- কোন জিনিস ভাগাভাগিতে বাড়ে? উত্তর : আনন্দ বা খুশি। ধাঁধাটি আমাদের ধর্মে এসে ভুল প্রমাণিত হয়ে যায়। ঈদের ‘আনন্দ’ শুধু কিছু বিশেষ অনুসারীদের জন্যে, এতে কোনো ভাগাভাগি চলে না। এ কেমন আনন্দ?

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

এ জাতীয় আরো খবর

দুর্যোগকালে  নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা

দুর্যোগকালে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা

শতবর্ষেও বঙ্গবন্ধু স্বমহিমায় ভাস্বর

শতবর্ষেও বঙ্গবন্ধু স্বমহিমায় ভাস্বর

সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্মদিন : একান্নে একান্ন যুক্ত হোক

সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্মদিন : একান্নে একান্ন যুক্ত হোক

আফগানিস্তান : জয়-পরাজয়ের সমীকরণ

আফগানিস্তান : জয়-পরাজয়ের সমীকরণ

 তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নপূরণের প্ল্যাটফর্ম সজীব ওয়াজেদ জয়

তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নপূরণের প্ল্যাটফর্ম সজীব ওয়াজেদ জয়

শুভ জন্মদিন তথ্যপ্রযুক্তির বরপুত্র সজিব ওয়াজেদ জয়

শুভ জন্মদিন তথ্যপ্রযুক্তির বরপুত্র সজিব ওয়াজেদ জয়