ঢাকা, রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ই-পেপার

আফগানিস্তান : জয়-পরাজয়ের সমীকরণ

শায়েখ আরেফিন

২০২১-০৭-২৭ ১৮:০০:৪৫ /

খবরের কাগজে আফগানিস্তান ঘটনাবলী বেশ জায়গা করে নিচ্ছে সম্প্রতি। একটি কাগজের একদিনের সংবাদের অংশবিশেষ তুলে ধরছি : ‘আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার পুরোপুরি সম্পন্ন হওয়ার প্রস্তুতির প্রেক্ষাপটে দেশটিতে সরকারি সেনাদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে তালেবান।...হেরাত প্রদেশে ইরানের সঙ্গে ইসলাম কঅলা সীমান্ত ক্রসিং তালেবান যোদ্ধারা দখল করে নিয়েছেন। হামলার মুখে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ কাস্টমস কর্মকর্তারা ইরানে পালিয়ে যান।...বালখ প্রদেশের উজবেকিস্তান সীমান্তে তালেবান যোদ্ধা ও আফগান সরকারি বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ চলছে। এই সপ্তাহের শুরুর দিকে উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ বাদাখশানের বেশিরভাগ এলাকা দখল করে নেয় তালেবান। এসময় একহাজারের বেশি আফগান নিরাপত্তাকর্মী তাজিকিস্তানে পালিয়ে যান।...তালেবান কর্মকর্তা শাহাবুদ্দিন দেলওয়ার ঘোষণা করেন, আফগানিস্তানের ৮৫ শতাংশ অঞ্চল এখন তালেবানের নিয়ন্ত্রণে।’

সাধারণভাবে এটি একটি খবর বা পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য। খবরজুড়ে রয়েছে এন্টিথিসিস (Antitheses)। পড়ার সময় মনের ভাবনা-কল্পনার সাথে প্রতিটি তথ্যের সংঘর্ষ ঘটেছে। পৃথিবীজুড়ে প্রশিক্ষিত সরকারি বাহিনীর সাথে যুদ্ধে জঙ্গি-মিলিশিয়া-বিদ্রোহী- সন্ত্রাসীদের পিছুহটার খবর পড়তে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের কাছে পরাজিত হয়ে প্রাণরক্ষায় পালিয়ে যাচ্ছে সরকারি বাহিনী! পরিশেষে সরকারি কর্মকর্তার পরিবর্তে তালেবান কর্মকর্তাকে বিজয়ীর বেশে ঘোষণা দিতে দেখি!

তালেবানের এই জয়ে বাংলাদেশের মুসলমান উল্লসিত।আর ধর্মজীবীরা খুশিতে আত্মহারা- তালেবান আবার কেড়ে নিবে আফগানিস্তান, শরীয়া আইনে চলবে দেশ! তবে একটু বিস্মিত হয়েছি যখন দেখেছি যুক্তরাষ্ট্রের চলে যাওয়ার খবরে খুশি বাংলাদেশের লেখক-শিক্ষক-সম্পাদক-বুদ্ধিজীবীরাও! একসময় বাংলাদেশের রাস্তায় মিছিলে স্লোগান উঠতো,  ‘আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান’। সে-সময় বাংলাদেশের ইসলামি বক্তারা দৃঢ় কণ্ঠে তালেবানের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করতেন। ন্যাটো বাহিনীর হাতে তালেবানের পতন হওয়ার পর থেকে মিছিল দেখা যায় না, কিন্তু তারা মনেপ্রাণে তালেবানের জয় কামনা করে। বিভিন্ন সাইটে জনতার মন্তব্যে এর স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। তালেবান কারা, কেমন ছিল তাদের শাসনকাল, সেদিকে একটু আলোকপাত করা যাক।

সমাজতন্ত্রের সাথে ইসলামের আদর্শিক দ্বন্দ্ব থাকায় ইসলামবাদীরা সবসময়ই সমাজতন্ত্রবিরোধী। ’৭০-এর দশকে আফগানিস্তানে সমাজতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল আফগান-মুজাহিদ গোষ্ঠী। ১৯৭৯ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি আফগানিস্তান দখল করে নেয়, তখন লড়াইরত মুজাহিদীনরা আমেরিকা তথা পশ্চিমী পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো থেকে প্রচুর সমর্থন-সহযোগিতা পেতে থাকে। প্রকৃত বন্ধু না হলেও ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু’ এই সূত্রে আমেরিকার মিত্র হয়ে ওঠে মুজাহিদ গোষ্ঠী। ’৮০-এর দশকের শেষভাগে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিতারিত হওয়ার পর চরম রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাতের মধ্যে মোহাম্মদ ওমরের (মোল্লা ওমর) নেতৃত্বে ১৯৯৪ সালে সৌদি ওয়াহাবি ভাবধারায় উদ্ভূত হয় তালেবান। মুজাহিদ গোষ্ঠীর একাংশ তালেবানে যোগ দেয়। খুব দ্রুত তালেবানের উত্থান ঘটতে থাকে এবং ১৯৯৬ সালে তারা আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে। এখানে উল্লেখ্য, ‘মুজাহিদীন বা তালেবান আমেরিকার সৃষ্টি’- কথাটি প্রচার পেলেও তা সঠিক নয়। এই উগ্রবাদীদের অস্তিত্ব আগে থেকেই ছিল, শুধু আফগানিস্তানে নয়, বহুদেশেই; আমেরিকা স্বীয় স্বার্থে ওইসময় শক্তি জুগিয়েছে এদের। তালেবানের ক্ষমতা গ্রহণের সাথে সাথে ওসামা বিন লাদেন আল-কায়েদার ঘাঁটি সুদান থেকে আফগানিস্তানে স্থানান্তর করেন। আমেরিকার হুশিয়ারী সত্ত্বেও তালেবান আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় আল-কায়েদাকে। দেশটির পর্বতের গুহা ও দুর্গম উপত্যকায় লুকিয়ে থেকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে ঘাঁটি স্থানান্তর করে। তালেবান ক্ষমতায় এসে শরীয়া আইনে (ইসলামি আইন) দেশ পরিচালনা শুরু করে। নারী স্কুল বন্ধ, কর্মক্ষেত্রে নারী নিষিদ্ধ, হিজাব-বোরকা বাধ্যতামূলক করে; অপরাধের শাস্তি হিসেবে হাতকাটা, দোররা, কতল ও কঙ্কর মেরে হত্যার বিধান চালু করে; গানশোনা, ছবিতোলা, ছবিআঁকা, কুকুর পোষা, দাড়ি কামানো, টিভি দেখা, সিনেমা দেখা, পুরুষদের হাঁটুর ওপর কাপড় পরা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-খেলাধুলাসহ সবধরনের বিনোদন নিষিদ্ধ করে। বাচ্চাদের ঘুড়ি ওড়ানোও নিষিদ্ধ করে তালেবান। এককথায় তারা কঠোর ইসলামি অনুশাসন প্রতিষ্ঠা করে আফগানিস্তানে। 

আফগানিস্তানে আমেরিকা নিজ প্রয়োজনে মুজাহিদ/তালেবান গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে ও ব্যবহার করেছে। মার্কিনদের নেপথ্য-ভূমিকা যা-ই হোক না কেন, তালেবানকে প্রকাশ্য স্বীকৃতি দিয়েছে তিনটি দেশ : পাকিস্তান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। মুসলমান সম্প্রদায় যখন আমেরিকাকে গালমন্দ করতে চায় তখন তালেবান সৃষ্টির দায় চাপিয়ে গালামন্দ করে। আবার তালেবানদের জয়ে উল্লসিতও হয়! চমৎকার স্ববিরোধ! এক্ষেত্রে আরও লক্ষ্য করা যায় যে তালেবানের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে আমেরিকা গালাগালপ্রাপ্ত হলেও তালেবান কর্তৃক সংঘটিত অপকর্মের দায় তাদেরকে (তালেবানকে) দিতে নারাজ। এ যেন অনেকটা—খুনের নেপথ্যে থাকা মানুষের সব দায়, কিন্তু যে-ব্যক্তি সরাসরি খুন করলো তার কোনো দায় নেই- এরকম। শক্তিমানের ‘ফুটবলে’ পরিণত হওয়াই যেন এদের নিয়তি।

আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়াকে মার্কিনদের পরাজয় হিসেবে দেখছে অনেকে। আল-কায়েদাকে প্রশ্রয় দেওয়ায় তালেবানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটলেও তা যুদ্ধ পর্যন্ত গড়াতো না, যদি ৯/১১-র ঘটনা না ঘটতো। টুইন-টাওয়ার আক্রমণের পর আমেরিকা আফগানিস্তানে অভিযান চালিয়ে তালেবানের পতন ঘটায়, অস্তিত্বশীল মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে কোনঠাসা করে ও শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে প্রতিশোধ নেয়। আমেরিকার প্রাথমিক বিজয় এর মাধ্যমে অর্জিত হয়ে যায়। কিন্তু বিশবছরের যুদ্ধে জঙ্গি-সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে নির্মূল করে চুড়ান্ত বিজয় অর্জন সম্ভব হয়নি। অস্ত্র দিয়ে ভাবাদর্শকে দমিয়ে রাখা যায় কিন্তু নির্মূল করা যায় অস্ত্র দিয়ে ভাবাদর্শকে দমিয়ে রাখা যায় কিন্তু নির্মূল করা যায় না। আমেরিকা চিরকালের জন্য আফগানিস্তানে আসেনি, তাই এই আংশিক সফলতা নিয়েই ফিরে যাচ্ছে।

প্রতিশোধ স্পৃহা থেকে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে হামলা করলেও এই হামলা সাধারণ আফগানদের জন্য শাপে বর হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র আফগানদের ত্রাতার ভূমিকায় আবির্ভূত হয়। রাষ্ট্রে মোটামুটি শৃঙ্খলা ফিরে আসে, নির্বাচন হয়, গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় বসে, নতুন সংবিধান গৃহীত হয়। নারীর ক্ষমতায়ন ঘটতে থাকে। তালেবান শাসনামলে, ১৯৯৯ সালে, মাধ্যমিক স্তরের স্কুলে একটি মেয়েও ভর্তি হয়নি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতো মাত্র ৯০০০ মেয়ে শিশু, সেখানে ২০১৯ সালে স্কুলে যাওয়া মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫ লাখ! সংসদে ও কর্মক্ষেত্রে নারীরা অংশগ্রহণ করতে পারছে। আফগানরা ক্রিকেট ফুটবল খেলতে পারছে। আফগান ক্রিকেটারদের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার পড়লে সে-সময়ের চিত্র পাওয়া যায়- খেলাধুলার জন্য কেমন শাস্তি পেতে হতো তাদের! তালেবান শাসনের অবসানে তারা খুশি। এককথায় আমেরিকার আগ্রাসনের কারণে নির্মম, অসভ্য, বর্বর তালেবান শাসনের পতন ঘটায় জীবনের স্পন্দন পায় আফগানিস্তানবাসী। ‘আগ্রাসন’ শব্দটি প্রচলিতভাবে নেতিবাচক হলেও এক্ষেত্রে তা পুরোপুরি খাটে না। শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত নাটক হ্যামলেটের একটি উক্তি মনে পড়ছে : I must be cruel only to be kind. Thus bad begins and worse remains behind. (ভাবার্থ : আমি ভালোর জন্যই খারাপ হতে বাধ্য হবো; খারাপটা চলুক, তবু অধিকতর খারাপটা তো বন্ধ হবে!)।

আফগানিস্তান থেকে বাইডেন প্রশাসনের সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত তালেবানের প্রত্যাবর্তনকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছে। আল-কায়েদাও নতুন করে নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের সুযোগ পাবে। আবার ইসলামিক স্টেটও (খোরাসান শাখা) আফগান ভূমি ব্যবহার করতে তৎপর হবে। এই সংগঠনগুলো বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী হামলার ষড়যন্ত্র করতে সক্ষম হবে। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা তো বটেই, বৈশ্বিক নিরাপত্তাও ব্যাপক হুমকির মধ্যে পড়বে।

ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তান যুদ্ধের কিছু মিল থাকলেও অমিলটাই বড়। ভিয়েতনামে যুদ্ধ শেষে স্থানীয় জনগণের মধ্যে দেখা গিয়েছিল দেশ গড়ার তীব্র আকাক্সক্ষা, নতুন সমাজ গঠনের উদ্যমী স্বপ্ন। কিন্তু আফগানরা কোনো স্বপ্ন দেখতে পারছে না, সামনে শুধু অনিশ্চয়তা। বিদেশি সেনার বিদায়ে সেখানে বিজয়ের উৎসব নেই, আছে সংঘাতের হুঙ্কার; কোনো আশা নেই, শুধু আশঙ্কা, সমাধান নেই, সংকট। দুদশকের এই যুদ্ধে জয়ের অনুপাত নির্ধারণ করা কঠিন, কিন্তু পরাজয়ের পাল্লা যে উভয়দিকেই ভারি তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

লেখক : বিশ্লেষক ও সমালোচক

এ জাতীয় আরো খবর

মেয়ে পেটে ধরা অপরাধ!

মেয়ে পেটে ধরা অপরাধ!

সাক্ষরতার আলো জ্বলে উঠুক ঘরে ঘরে

সাক্ষরতার আলো জ্বলে উঠুক ঘরে ঘরে

দক্ষিণ ঢাকায় মেডিকেল বর্জ্য অব্যবস্থাপনার দায় কার

দক্ষিণ ঢাকায় মেডিকেল বর্জ্য অব্যবস্থাপনার দায় কার

উন্নয়নে এনজিও কর্মীদের অবদান এবং করোনাকালে তাদের জীবন-জীবিকা

উন্নয়নে এনজিও কর্মীদের অবদান এবং করোনাকালে তাদের জীবন-জীবিকা

আফগানিস্তানে তালেবানি শাসন এবং ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

আফগানিস্তানে তালেবানি শাসন এবং ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

করোনায় বাড়ছে শিক্ষিত বেকার

করোনায় বাড়ছে শিক্ষিত বেকার