ঢাকা, রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ই-পেপার

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পেশাজীবী নারীদের ভাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদক :

২০২১-০৮-২৭ ১৯:০৯:২১ /

আর্থসামাজিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে নারী। তবুও শান্তি, নিরাপত্তা, অধিকার সব দিক দিয়ে সমাজে দেখা যায় নারীর অবস্থান পুরুষের চেয়ে নীচে। ফলশ্রুতিতে  ‘নারী’ শব্দের সাথে আরেকটি  মর্মাহত শব্দ ‘নির্যাতন’ জোড়া লেগে যায়। বর্তমান সময়ে এই নারী নির্যাতনের ভয়াবহতা কেমন এবং  নারী নির্যাতন প্রতিরোধে  করণীয় কিছু  দিক নিয়ে চারজন ভিন্ন পেশার নারীদের মুক্তচিন্তা তুলে ধরেছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ফারহানা ইয়াসমিন।

নারী নির্যাতন রোধে অর্থনৈতিক  মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে
দিল আফরোজ খানম, সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৪৯ বয়সী নারীদের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশই নির্যাতনের স্বীকার। ব্র্যাকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, নির্যাতনের শিকার নারীদের শতকরা ৮২ ভাগই বিবাহিত নারী। অর্থাৎ, বিবাহিত নারীরাই নির্যাতনের শিকার হন বেশি। নারী নির্যাতনের মধ্যে হত্যা, ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন অন্যতম এবং  শতকরা ৬১ ভাগ পরিবারের সদস্যদের হাতেই শতকরা ৭৭ ভাগ নারী নির্যাতনের শিকার হন।

কেন এত নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে? একজন সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে আমি মনে করি পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এর প্রধান কারণ। আর সামাজিকীকরণের মাধ্যমেই আমরা পুরুষতান্ত্রিকতা তৈরি এবং লালনপালন করি। এছাড়াও নারীর অধঃস্তন সামাজিক মর্যাদা, সম্পত্তির অধিকার না থাকা, ধর্মীয় কুসংস্কারও এর জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারন।সমাজে যতদিন না নারীদের বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর এবং যোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত না হবে ততদিন এই নির্যাতন বন্ধ হবে না। আর তার জন্য নারীর অর্থনৈতিক মুক্তিই একমাত্র চাবিকাঠি।

কর্মক্ষেত্রে মানসিক নির্যাতন থেকে মুক্তি চাই
সাবিহা নুর, ডায়েটিশিয়ান, রাহাত আনোয়ার হাসপাতাল, বরিশাল

২৪ আগষ্ট নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস! ভাবতেই কেমন লাগে! নির্যাতন ব্যাপারটাই তো অদ্ভুত! কারণ, প্রতিটি নির্যাতনের পেছনে থাকে  অহেতুক তীব্র ক্ষোভ যা ব্যক্তির সীমাহীন অসফলতা থেকেই উদ্ভুত। এই অসফলতা ব্যক্তিগত, শিক্ষাক্ষেত্র, কর্মক্ষেত্র বা  প্রাত্যহিক জীবন থেকেই প্রবাহিত। যদিও বর্তমান নারীরা আর আবদ্ধ নেই চার দেওয়ালের মাঝে। তবে তারা  প্রতিনিয়ত ব্যস্ত অফিসের  চার দেওয়ালের মাঝে হচ্ছেন বুলিংয়ের শিকার। স্বাধীনভাবে চলাফেরা, পছন্দমতো পোশাক-পরিচ্ছেদও নেই কোনো স্বস্তি ও শান্তি। প্রকাশ্যে, আড়ালে-অগোচরে তাকে ও তার অঙ্গভঙ্গি নিয়ে গল্পের আসর জমে পুরুষশাসিত সমাজের অফিসে। অসফল ও স্বঘোষিত হতাশ ব্যক্তি নিজেকে সবল ও সঠিক প্রমাণ করার অপপ্রচেষ্টা চালায় নারী  প্রতিপক্ষের উপর। এগুলো যতই হোক মানসিক নির্যাতন  কিন্তু এর গভীরতা শারীরিক ক্ষতের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
নারীর নির্যাতন প্রতিরোধ নামক একটি দিবস পালন কতটুকু কাজে  আসবে জানি না, তবে  বৈষম্যহীন ও সম-অধিকারের সমাজ প্রতিষ্ঠায় করণীয়গুলোই আমাদের সমাজ থেকে নারী নির্যাতনের চিত্র অকপটে মুছে দিতে পারে।

সাইবার নিপীড়ন কমাতে হবে
নাদিয়া নাহিদ মুমু, সংবাদ উপস্থাপক, মোহনা টেলিভিশন

মানব সমাজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাস্তব জীবনে দেখা যায় সেই নারী নানা কারণে অবহেলিত ও নির্যাতিত হচ্ছে। বর্তমান সময়ে নারী নির্যাতনে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার হচ্ছে যেটাকে আমরা সাইবার নিপীড়ন বলে থাকি। ইন্টারনেট ব্যবহার ও আইসিটি প্রযুক্তির অন্যতম নেতিবাচক দিক হলো এই সাইবার নিপীড়ন। হঠাৎ করেই তরুণ প্রজন্মের হাতের মুঠোয় আধুনিক এই প্রযুক্তি চলে এসেছে। তারা এই প্রযুক্তির শক্তিশালী হতিয়ার ‘ইন্টারনেট’ ব্যবহার করে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রেমের সম্পর্কের ছবি, অডিও, ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট করে মেয়েদেরকে ব্লাকমেইল করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। অনেক সময় নারীর ছবি ফটোশপের মাধ্যমে বিকৃত করে ফেসবুকে ছেড়ে দিচ্ছে। এমন সব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ইন্টারনেট প্রযুক্তিগত সিস্টেম ও ব্যবহারকারীর উপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা দরকার। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা জোরদারকরণ অতীব জুরুরি। এতে করে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে এবং সুন্দর একটি সমাজ গঠিত হবে বলে আশা রাখি।

চলমান মহামারিতেও নারীরা অনেক বেশি সহিংসতার শিকার
আমিনা,  সাব ইন্সপেক্টর, বিএমপি বরিশাল

নির্যাতিতা নারীদেরকে পুরুষশাসিত সমাজ দাসীর আবরণে জড়িয়ে রেখেছে। আজও  তারা সময়ের তালে তাল মেলাতে পারিনি। দেশে নারীর সুরক্ষায় রয়েছে বিভিন্ন আইন। তবুও সমাজে বন্ধ হচ্ছে না নারীর প্রতি সহিংসতার সবচেয়ে কুৎসিৎ ও বিকৃত অপরাধ ধর্ষণের ঘটনা। এমনকি রেহাই পাচ্ছে না শিশুরাও। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মতে, ২০২০ সালে জানুয়ারি- আগস্ট পর্যন্ত ধর্ষণ, যৌন হয়রানি ও পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে ১ হাজার ২০৪ জন নারী এবং এপ্রিল-জুলাই(২০২০) সেই সংখ্যা যেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৯৫৪ জন নারী ও শিশু। এই সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ কোভিড-১৯।  মহামারি চলাকালে বেশি মাত্রায় সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে। আমার থানায় ডিউটির অভিজ্ঞতা থেকে বলতে গেলে নারীদের অধিকাংশ অভিযোগ আসে স্বামীর চাকরি না থাকায় বা বাসায় বেশি সময় থাকার কারণে। কোন কোনো পরিবার যৌতুকের দাবিও করে বসে, পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার জন্য। এর পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন অহরহ। অনেক শিক্ষিত এবং চাকরিজীবী নারীরাও এই অত্যাচারে বাইরে নন।

এর থেকে বাঁচার উপায় হলো, আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মূল্যবোধের আমূল পরিবর্তন। একজন নারীকে ‘অবলা’ নারীতে বিশ্লেষায়িত না করে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গণ্য করা যারা তাদের পরিবার ও সমাজের জন্য বোঝা নয় বরং সম্পদ। আত্মনির্ভরশীলতা ও আত্নমর্যাদায় নারীকে শক্তিশালী করলেই মিলবে মুক্তি।

বাবু/ফাতেমা

এ জাতীয় আরো খবর

আশ্রয়হীন শিশুদের নিরাপদ আশ্রয় ‘ডিআইএসএস’

আশ্রয়হীন শিশুদের নিরাপদ আশ্রয় ‘ডিআইএসএস’

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু আমার নানা ভাই...

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু আমার নানা ভাই...

ত্রিশ বছরেও সংস্কার হয়নি সেতু বন্ধনের ব্রীজ

ত্রিশ বছরেও সংস্কার হয়নি সেতু বন্ধনের ব্রীজ

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে  পেশাজীবী নারীদের ভাবনা

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পেশাজীবী নারীদের ভাবনা

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেতু পারাপার

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেতু পারাপার

আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে সাগুতেও

আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে সাগুতেও