ঢাকা, রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ই-পেপার

উন্নয়নে এনজিও কর্মীদের অবদান এবং করোনাকালে তাদের জীবন-জীবিকা

ড. মতিউর রহমান

২০২১-০৯-০৬ ১৯:৩৮:১০ /

গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক খাতে অনেক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটেছে। এই উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি এনজিও সেক্টরের অবদানও অনেকে স্বীকার করেন। বিশেষ করে এক্ষেত্রে এনজিও সেক্টরের মাঠপর্যায়ের কর্মীদেরও রয়েছে ব্যাপক অবদান। এদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক ও আচরণগত উন্নয়নে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে এনজিও কর্মীরা। কারণ এনজিও কর্মীরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় গিয়ে সেবা পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য মাঠ পর্যায়ের এনজিও কর্মীদের জীবন মানের তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। 

এনজিও কর্মীদের অবদান সত্ত্বেও তাদের চলার পথ কখনো মসৃণ ছিলনা। প্রথম দিকে কাজ করতে গেলে কমিউনিটি থেকে বেশ বাঁধার মুখে পড়তে হয়েছে এনজিও ও এনজিও কর্মীদেরকে। এমনকি এনজিওরা আমাদেরকে বিধর্মী বানিয়ে ফেলবে বা নারীদের পাচার করে দেবে ইত্যাদি গুজবও ছিলো। এছাড়া নারীদের নিয়ে সভা সমিতি করার বিরুদ্ধেও ছিলো ফতোয়া। এসব কারণে অনেক সময় এনজিও কর্মীদের অপমান অপদস্ত হতে হয়েছে। সরকার সবসময় এনজিওদের কাজের সুফল বুঝতে পেরে তাদের সমর্থন করায় অনেক সমস্যার সমাধান সহজ হয়েছে।

এনজিও কর্মীরা ভালো কাজ করেন একথা অনেকেই স্বীকার করেন। কিন্তু এই এনজিও কর্মীরা প্রতিনিয়ত অবহেলার শিকার। বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ের এনজিও কর্মীদের প্রতি সমাজের মানুষের মনোভাব এখনো নেতিবাচক। বলতে গেলে কোন এনজিও কর্মী পরিচয়ে বিয়ে করতেও বেগ পেতে হয়। অথচ এই পেশাটি অত্যন্ত সৎ ও মানবিক। সেবার মানদন্ডে বিচার করলে এনজিও কর্মীরা নিবেদিত। তারা প্রতিনিয়ত সমাজের মানুষের উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন। কোনোপ্রকার সুদ, ঘুষ, দুর্নীতির সাথে তাদের জড়িত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ঝড়, তুফান, রোদ, বৃষ্টি উপেক্ষা করে দিনে ১৪/১৫ ঘণ্টা পরিশ্রম করে মাস শেষে যে বেতন তারা পান তা দিয়ে চার সদস্যের একটি পরিবারে মাসের ১৫ দিনও ঠিকমত চালাতে পারেন না।

প্রতিদিন মাঠপর্যায়ে হাজারো এনজিও কর্মী পায়ে হেঁটে, বাইসাইকেল ও মোটর সাইকেলে করে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষের দোরগোড়ায় শিক্ষা, অর্থ, প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছেন। তারা এমন সব এলাকায়, এমন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করেন, যেখানে বা যাদের সাথে এই কাজগুলো করতে অনেক কম মানুষকেই দেখা যায়। দুর্গম চরাঞ্চলে, পাহাড়ে, হাওড়ে, বাওড়ে দিনের পর দিন অতিবাহিত করে তারা সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন। অথচ তাদের বেতনাদি ও অন্যান্য সুবিধা বলতে গেলে তেমন কিছুই না। করোনাকালে মাঠপর্যায়ের এনজিও কর্মীদের অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে পড়েছে।

এনজিও কর্মীদের বিশেষ করে ক্ষুদ্রঋণের সাথে জড়িত মাঠপর্যায়ের কর্মীদের প্রতিদিন অফিস শুরু হয় কিন্তু শেষ হয় না। কাজের শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। মাসের প্রতিটা দিন রোদ, বৃষ্টি মাথায় নিয়ে তাদের ঘুরতে হয়। এমনকি অনেক সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটিও তারা পরিবারের সাথে কাটাতে পারেন না। তারপরও তারা মন খারাপ করেন না। সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য ও সংস্থার জন্য মনপ্রাণ দিয়ে  কাজ করেন।

এনজিও কর্মীদের কাজের জন্য বিশেষ করে ক্ষুদ্রঋণের সাথে যারা জড়িত তাদের জন্য গ্রামের অসহায় মানুষের সাথে যারা চড়াহারে সুদের কারবারি করত তারা এখন আর সেটি করতে পারে না। এজন্য তারা এনজিও কর্মীদের বিরুদ্ধে নানা কুৎসা রটনা করে। অনেকেই এনজিওদের কাজ না বুঝে সমালোচনা করেন ও তাদের সাথে হিংস্র আচরণ করেন। অথচ যেকোনো দুর্যোগে এনজিও কর্মীরাই আগে এগিয়ে আসেন সমাজের দূর্গত মানুষের সহায়তার জন্য। এনজিও কর্মীরাই পারেন মাত্র একসপ্তাহে জনসংখ্যা জরিপ করতে বা জনমত জরিপ করতে। তারাই পারেন সঠিকভাবে সঠিক মানুষের কাছে সকল ধরনের ত্রাণ বা সাহায্য পৌছে দিতে বা যেকোনো তথ্য দ্রুত সরবরাহ করতে।

তাহলে আমরা কেনো এনজিও কর্মীদের কাজকে সম্মান করবো না? কেন তাদেরকে ও তাদের কাজকে ছোট মনে করবো? কেনো তাদের সাথে খারাপ আচরণ করব? সারাবিশ্বে এই ভয়াবহ করোনাভাইরাসের সময় তাদের অনেকেই ঠিক মতো বেতন বোনাস পাননি। কোন সরকারি সাহায্য সহযোগিতাও তারা পান না। অনেকেই পরিবার নিয়ে অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। তারপরও তারা মনোবল হারাননি। সাধারণ মানুষের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন।

দেশের একটি বড় সেক্টর এনজিও কর্মীদের নিয়ে বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। প্রয়োজন একটি সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বয়। এনজিওদের কাজের তদারকি বা সহযোগিতা করার জন্য সরকারিভাবে বা এনজিওদের পক্ষ থেকে একটি জাতীয় কমিটি বা দপ্তর থাকা খুবই জরুরি যারা মাঠপর্যায়ে এনজিও কর্মীদের স্বার্থে কাজ করবে। কারণ, এনজিও কর্মীরা দিন-রাত পরিশ্রম করলেও তাদের সুযোগ সুবিধা ও বেতন কাঠামো ভিন্ন। বিশেষ করে ছোটো এনজিও’র ক্ষুদ্রঋণ সেক্টরে যারা কাজ করেন তাদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা অনেক কম। অনেকেই আছেন যারা বিশ-পঁচিশ বছর ধরে কাজ করে অবসরে যান একদম খালি হাতে। বীমা সুবিধা না থাকায় অনেকেই দুর্ঘটনায় পড়লেও সংস্থা থেকে কোনো সহায়তা পান না। সুতরাং, এনজিওদের ক্যাটেগরি করে বিভিন্ন পদে কর্মরত সকল এনজিও কর্মীর জন্য একই রকম সুযোগ-সুবিধা ও বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

এই বিষয়ে এনজিও উদ্যোক্তাদের আরো ভাবা প্রয়োজন বলে মনে করি। যদি সকল এনজিওর নিয়মনীতি এক হয় তাহলে কর্মী অসন্তোষ থাকবেনা এবং কর্মীরা একটি প্রতিষ্ঠানে কাজে মনোনিবেশ করতে পারবেন। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, কোনো কোনো সংস্থায় উচ্চ বেতন কাঠামো আবার কোনো সংস্থায় আছে নিম্ন বেতন কাঠামো। কোনো কোনো সংস্থা উৎসবভাতা প্রদান করে, কোনোটি করেনা। অনেক সংস্থায় কর্মীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্রাচ্যুইটি, কল্যাণ তহবিল, বীমা সুবিধা, চিকিৎসা, ভ্রমণ, মাতৃত্বকালীন, শিশুসুরক্ষা, অবসরকালীন ভাতা প্রভৃতি দিয়ে থাকে। আবার কোনো কোনো সংস্থায় এসব কিছুই নেই বা আংশিক আছে। ছুটি সংক্রান্ত তেমন নিয়ম নীতিও নেই। কিছু সংস্থায় আছে বৃহস্পতিবার অর্ধেক বেলা ও শুক্রবার পূর্ণ বন্ধ, কিছু সংস্থায় শুক্র, শনিবার পূর্ণ দিবস ছুটি আবার কিছু কিছু সংস্থায় শুক্রবারেও কাজ করতে হয়। সুতরাং, এনজিওগুলোর  শ্রেণিকরণ করে একটি নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা উচিত বলে অনেকে মনে করেন।

দেশের উন্নতি হলেও এনজিও কর্মীদের তেমন কোন উন্নতি হয়নি। অনেক কর্মী চাকরি শেষে জীবনযাপনে হিমশিম খাচ্ছেন। এনজিও কর্মীদের পক্ষে কথা বলার জন্য তাদের কোন প্লাটফর্ম নেই। সরকারিভাবেও এনজিও কর্মীদের নিয়ে খুব একটা ভাবা হয়নি কখনো। বিশেষ করে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিতে মাঠপর্যায়ে যেসকল কর্মী কাজ করেন তাদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। স্বল্পবেতনে তারা কাজ করেন। ছোট ও মাঝারি সংস্থার ক্ষুদ্রঋণ কর্মীদের অবস্থা আরো শোচনীয়। তাদের জন্য কোনো নিয়ম-নীতি বা সুযোগ-সুবিধা নেই। করোনাকালে তাদের অনেকেই কাজ হারিয়েছেন বা অর্ধেক বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন শুধু পরিবারের সদস্যদের মুখে দু’মুঠো খাবার যোগানের জন্য। অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণের তো প্রশ্নই আসে না।

বড় কোনো অসুখ হলে বা দুর্ঘটনাক্রমে কোনো এনজিও কর্মী মারা গেলে ছোট অনেক এনজিও’র পক্ষে খুব একটা বেশি কিছু করার থাকেনা, সীমিত সাধ্যের কারণে। ফলে সেই কর্মীর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের পড়তে হয় চরম বিপাকে। তাই এনজিও কর্মীদের বীমার আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। বেতন ভাতা, অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও নিশ্চিত করার জন্য সংস্থা ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করি।

বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে বিশেষ করে দরিদ্র ও হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এনজিও ও মাঠপর্যায়ের এনজিও কর্মীদের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু এখনো জাতীয়ভাবে এই সফলতার তেমন কোনো স্বীকৃতি নেই। সুতরাং সময় হয়েছে জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে এনজিও কর্মীদের কাজের স্বীকৃতি দিয়ে তাদের সম্মানিত করা ও উৎসাহিত করা। এটি আমাদের সবার নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। মাঠপর্যায়ের এনজিও কর্মীদের প্রতি সংস্থাগুলোর আরো সহানুভূতিশীল হতে হবে বলে মনে করি। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে আরো কর্মীবান্ধব হওয়া দরকার। সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া কর্মী ছাটাই না করাও বিবেচনা করা উচিত। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কঠোর পরিশ্রমের মূল্যায়ণ করা, উন্নত প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন করা দরকার বলে মনে করি। সরকারিভাবেও তাদের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে প্রয়োজনীয় নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করি।

লেখক : গবেষণা পরামর্শক, হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (এইচডিআরসি), ঢাকা

এ জাতীয় আরো খবর

মেয়ে পেটে ধরা অপরাধ!

মেয়ে পেটে ধরা অপরাধ!

সাক্ষরতার আলো জ্বলে উঠুক ঘরে ঘরে

সাক্ষরতার আলো জ্বলে উঠুক ঘরে ঘরে

দক্ষিণ ঢাকায় মেডিকেল বর্জ্য অব্যবস্থাপনার দায় কার

দক্ষিণ ঢাকায় মেডিকেল বর্জ্য অব্যবস্থাপনার দায় কার

উন্নয়নে এনজিও কর্মীদের অবদান এবং করোনাকালে তাদের জীবন-জীবিকা

উন্নয়নে এনজিও কর্মীদের অবদান এবং করোনাকালে তাদের জীবন-জীবিকা

আফগানিস্তানে তালেবানি শাসন এবং ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

আফগানিস্তানে তালেবানি শাসন এবং ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

করোনায় বাড়ছে শিক্ষিত বেকার

করোনায় বাড়ছে শিক্ষিত বেকার