ঢাকা, সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০ ই-পেপার

ধর্ষণ : সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কতদূর

সালাহউদ্দিন ওয়াহিদ প্রীতম :

২০২০-১০-২৬ ২১:৪৭:৪০ /

কেস স্টাডি (১): ২০১৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ভোরবেলায় রাজধানীর বাড্ডা এলাকার একটি বাসায় ধর্ষণের শিকার হন এক গৃহপরিচারিকা। মো. ইউসুফ আলী নামে এক ব্যক্তির বাসায় কাজ করতেন ওই গৃপরিচারিকা। ঘটনার দিন ইউসুফের স্ত্রী বাসায় ছিলেন না। ধর্ষণের পর ওই গৃহপরিচারিকা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন এবং প্রচুর রক্তপাত হচ্ছিল তার। এতে ভয় পেয়ে পালিয়ে যান ইউসুফ। পরে ওই দিন দুপুরে ইউসুফের  স্ত্রী বাসায় ফিরে এসে পরিস্থিতি দেখে গৃহপরিচারিকার চাচাত বোনকে খবর দিয়ে তার হাতে ওই গৃপরিচারিকাকে সোপর্দ করেন। গৃপরিচারিকার চাচাত বোন সেদিনই ইউসুফকে একমাত্র আসামি করে বাড্ডা থানায় একটি মামলা করেন। মামলার সপ্তাহখানেক পর নেত্রকোনা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ইউসুফকে। আদালতে মামলার চার্জশিটও জমা পড়েছে, তবে অভিযোগ গঠন করে বিচার প্রক্রিয়া এখনো শুরু করা যায়নি। এ পর্যন্ত অভিযোগ গঠনের দিন পিছিয়েছে ছয় বার।

অভিযোগ গঠণ না হওয়ার কারণ প্রসঙ্গে এই মামলায় ভিকটিমের আইনজীবী প্রকাশ রঞ্জন বিশ^াস বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন, ‘এই মামলায় ডিএনএ রিপোর্টে অভিযুক্তের লুঙ্গিতে বীর্যের দাগ পাওয়া গেলেও বায়োলজিক্যাল ও মাইক্রোবায়োলজিক্যাল রিপোর্টে ভায়োলেন্সের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এছাড়া আলামত হিসেবে জব্দ তালিকায় ভিকটিমের সালোয়ার কামিজ ও রক্তমাখা তুলা জব্দ করা হয়েছে। তবে আলামত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বিছানার চাদর জব্দ করা হয়নি।’ 

‘এজলাসে আসামি পক্ষের আইনজীবী বলেছেন, প্রাপ্ততথ্য ও জব্দ আলামত থেকে এটি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় না যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি ওই নারীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেছেন। যে তুলা জব্দ করা হয়েছে তা ঋতুস্রাবের তুলা; কারণ ধর্ষণের পর কেউ তুলা দিয়ে রক্ত মুছে দিতে এগিয়ে আসে না।’

অভিযোগ গঠন না হওয়ায় মামলার বিচারকাজ এখনো শুরু করা যায় নি। গ্রেপ্তার ইউসুফ এখনো কারাগারে আছেন।

কেস স্টাডি (২) : ২০০৯ সালের ১৩ অক্টোবর শরীয়তপুর জেলার পালং থানার তুলসা গ্রামের একটি বাড়ির বেতবাগানে কিশোরী ডালিয়ার লাশ পাওয়া যায়। তদন্তে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। মামলাটি তদন্ত করেন পালং থানা পুলিশের উপপরিদর্শক সুনীল কুমার কর্মকার। অভিযোগপত্রের ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৪ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়।

২০১২ সালে প্রমাণের অভাবে সেই মামলার একমাত্র আসামি সিরাজ সরদার ওরফে আওরঙ্গকে খালাস দিতে বাধ্য হন ঢাকার চার নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন বিচারক মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, ‘ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে, কিন্তু এই আসামিই যে তা করেছে তা বাদিপক্ষ আদালতে প্রমাণ করতে পারেনি। একটি শিশুকন্যাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হলো, কিন্তু বিচার পেল না পরিবারটি।’ মামলার সঠিক তদন্ত হয়নি বলেও মন্তব্য করেন বিচারক। 

বিগত কয়েক বছরে দেশের আলোচিত ধর্ষণ মামলাগুলোর পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৬ সালের মার্চে কুমিল্লার ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় সোহাগী জাহান তনু ধর্ষণ এবং হত্যা মামলার তদন্ত এখানো শেষ হয়নি৷২০১৭ সালের মর্চে বনানীর রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণ মামলার বিচার কবে শেষ হবে তা এখনো অনিশ্চিত। ২০১৭ সালের নভেম্বরে টাইঙ্গাইলে বাসে রূপা খাতুন ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় নিম্ন আদালত দ্রুতই রায় দেন। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চার জনকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এখন মামলাটি উচ্চ আদালতে আপিলে আটকে আছে। এভাবে ঝুলে থাকে ধর্ষণ মামলাগুলো; নিম্ন আদালতে রায় হলেও উচ্চ আদালত হয়ে চূড়ান্ত রায় পেতে বছরের পর বছর লেগে যায়। শিল্পপতি লতিফুর রহমানের মেয়ে শাজনীন তাসনিম রহমান ধর্ষণ ও হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় পেতে সময় লেগেছে ১৮ বছর। চূড়ান্ত রায়ে ২০১৬ সালের আগস্টে একজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। ১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিল রাতে শাজনীনকে ঢাকায় তাদের নিজ বাসায় ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়।

বাংলাদেশ পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, গতবছর ২০১৯ সালে সারা দেশে ৫ হাজার ৪০০ নারী এবং ৮১৫টি শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। ২০১৮ সালে শিশু ধর্ষণের মামলা ছিল ৭২৭টি এবং নারী ধর্ষণের মামলা ছিল ৩ হাজার ৯০০টি। পুলিশের হিসাব বলছে, গতবছর ধর্ষণের কারণে ১২ জন শিশু এবং ২৬ জন নারী মারা যান। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ২১ জন নারী ও ১৪ জন শিশু।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ধর্ষণ এবং গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন মোট ৯৭৫ জন নারী ও শিশু। এর মধ্যে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে ৭১৯টি। ২০১৯ সালে আসকের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, আগের বছর ২০১৮ সালে সারাদেশে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হন ১ হাজার ৪১৩জন নারী ও শিশু। এর বিপরীতে মামলা হয়েছে ৯৯৯টি। 

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এর পরিসংখ্যান বলছে, গতবছর ২০১৯ সালে সারা দেশে মোট ৯০২ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৫৬।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম এর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৯ সালের প্রতিবেদন প্রতি মাসে গড়ে ৮৪টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এছাড়া এক বছরে অর্থাৎ ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে নারী ও শিশুর উপর যৌন নির্যাতন বেড়েছে ৭০ শতাংশ। ২০১৯ সালে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১ হাজার ৩৮৩ শিশু। ২০১৮ সালের চেয়ে গতবছর শিশুধর্ষণ বেড়েছে ৭৬ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ।

ধর্ষণের মামলা গ্রহণ বিষয়ক বিচার প্রক্রিয়ার জটিলতাগুলোর বিষয়ে ২০১৯ সালে ‘কনভিকশন অব রেপ কেসেস: আ স্টাডি অন মেট্রোপলিটন সিটি অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গবেষণা পরিচালনা করে বাংলাদেশ পুলিশ। এতে থানায় যাওয়ার পর থেকে নারী ও শিশুরা বিচারের প্রতিটি ধাপে কী কী প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়, তা দেখানো হয়। গবেষণার আওতাভুক্ত এলাকা হিসেবে নেওয়া হয় দেশের ছয়টি মহানগরের ২২টি থানা। এসব থানায় ২০১৪ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে হওয়া ৫৭৫টি মামলার এজাহার, ধর্ষণের শিকার ১৭৫ জন নারী ও শিশু এবং ১৯১জন তদন্তকারী কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে গবেষণা প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করে পুলিশ স্টাফ কলেজ সদর দপ্তরে জমা দেওয়া হয় ওই বছর মার্চ মাসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে:
* মামলা দিতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হয়েছেন অর্ধেক নারী-শিশু
* যথাযথভাবে মামলা গ্রহণের হার ৫৭.৭%
* থানায় গিয়ে হয়রানির শিকার হয়েছেন ২১.৭% অভিযোগকারী
* পুলিশ নিরুৎসাহিত করেছে কিন্তু মামলা নিয়েছে ১৮.৩% অভিযোগকারীর ক্ষেত্রে
* পুলিশের কটুক্তি শুনতে হয়েছে ৬.৩% অভিযোগকারীকে
* মামলা না করতে হুমকি পেয়েছেন ৪% অভিযোগকারী
আইন কতটুকু কার্যকর
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (২০০০) এ ধর্ষণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোল বৎসরের অধিক বয়সের কোন নারীর সঙ্গে তার সম্মতি ছাড়া বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তার সম্মতি আদায় করে, অথবা ষোল বৎসরের কম বয়সের কোনো নারীর সঙ্গে তার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌনসঙ্গম করেন, তাহলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করেছেন বলে গণ্য হবেন।

সম্প্রতি সারাদেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়া এবং এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নারী অধিকার সংগঠন ও সাধারণ মানুষের আন্দোলন ও প্রতিবাদী অবস্থানের প্রেক্ষিতে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (২০০০)’ এ ধর্ষকের শাস্তির পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ সরকার। গত ১৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মাধ্যমে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়।

তবে আইনের এই পরিবর্তন ধর্ষণের শিকার বা ধর্ষিতার ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে কতখানি কার্যকর ভূমিকা রাখবে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আইনজীবীরা। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ৭ এর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফারহানা আফরোজা আহমেদ এ বিষয়ে বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন, ‘ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পরিবর্ত মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন প্রণয়ন অবশ্যই স্বাগত জানানোর মতো একটি ব্যাপার, তবে এখানে একটি বিষয় বিবেচনা করতে হবে- আইন এবং বিচার প্রক্রিয়া সম্পুর্ণ আলাদা বিষয়। আইন তখনই যথাযথভাবে কার্যকর করা সম্ভব যখন বিচার প্রক্রিয়া যথাযথ হয়। বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো সংস্কার কিন্তু আনা হয়নি।’

তিনি জানান, কোনো ধর্ষণ মামলায় ভিকটিম বা ধর্ষিতার পক্ষে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় একজন আইনজীবীর মূল কাজ মামলার অভিযোগের যথার্থতা প্রমাণ করা এবং মামলায় অভিযুক্ত আসামি যে ঘটনার জন্য দায়ী তা প্রমাণ করা, যা বিদ্যমান বিচারব্যবস্থায় যথেষ্ট কঠিন।

ফারজানা বলেন, ‘প্রথম যে বিষয়, আদালতে প্রমাণ করতে হয় যে ধর্ষণ ঘটেছে। এক্ষেত্রে মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট), মামলায় জব্দ করা আলামত এবং ধর্ষিতার মেডিকেল রিপোর্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই তিনটিতে কোনো সমস্যা থাকলে মামলার মেরিট দুর্বল হয়ে যায়।’

‘আমাদের সমাজে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষণের ঘটনায় মামলা করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়। এরপরও যে মামলাগুলো দায়ের করা হয়, সেগুলোর চার্জশিটে অনেক সময় সঠিক তথ্য থাকে না। আসামির তালিকায় গরমিল থাকে অনেকসময়। ঘটনার বিবরণে অস্পষ্টতা থাকে। আলামত জব্দের ক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায় অপরাধ প্রমাণের জন্য যে জিনিসগুলো প্রয়োজন, সেগুলো ঠিকঠাকমতো পাওয়া যায় না। আর একটি বিষয় হচ্ছে ধর্ষিতার মেডিকেল রিপোর্ট। ধর্ষণ প্রমাণের জন্য ধর্ষিতার মেডিকেল রিপোর্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যথাসময়ে ধর্ষিতার মেডিকেল টেস্ট করা হয় না। অনেক সময় ধর্ষিতা নিজে তার দেহে থাকা এভিডেন্স নষ্ট করে ফেলে, আবার অনেক সময় এখানে দুর্নীতি হয়; দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক অসম্পুর্ণ প্রতিবেদন জমা দেন।’

ফারহানা জানান, অভিযোগ প্রমাণের পর আসে বিচার প্রক্রিয়ার বিষয়টি আসে। এক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় সাক্ষী সমস্যা, বিশেষ করে আসামি প্রভাবশালী হলে সাক্ষীদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। 
‘যিনি ঘটনার শিকার এবং অন্যান্য সাক্ষী যারা থাকেন, তারা অনেক সময় হুমকির সম্মুখীন হন। তাদের কোনো সুরক্ষা থাকে না। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ও দণ্ড বিধিতে সাক্ষীদের রক্ষাকবচ সীমিত।’

এক্ষেত্রে তিনি উদাহারণ হিসেবে টানেন আলোচিত হোটেল রেইন্ট্রি ধর্ষণ মামলার ঘটনা। ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ রাজধানীর বনানীতে হোটেল রেইন্ট্রিতে আপন জুয়েলার্সের মালিক দিদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ধর্ষণের শিকার হন বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী। নারী ও শিশুনির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ৭ এ মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। তিনি নিজে এই মামলায় বাদিপক্ষের আইনজীবী। তিন বছরের অধিক সময় পেরিয়ে গেলেও  মামলার বিচার প্রক্রিয়ার নিষ্পত্তি এখনো হয়নি সাক্ষীর অনুপস্থিতির কারণে।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কয়েকজন সাক্ষীকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমনও দেওয়া হয়েছে, তারপরও তারা আদালতে আসছেন না।’ 

ঢাকার নিম্ন আদালতে গত প্রায় ২৭ বছর ধরে নারী ও শিশু নির্যাতন বিষয়ক মামলা করছেন জেষ্ঠ্য আইনজীবী প্রকাশ রঞ্জন বিশ^াস। বাংলাদেশ বুলেটিনকে তিনি বলেন,‘ যদি যৌন বিশৃঙ্খলা, যৌন স্বেচ্ছাচারিতা, মাদকের অবাধ বিস্তার, পর্নোগ্রাফি ইত্যাদি রোধ করা না যায়, তাহলে ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান সমাজ থেকে ধর্ষণ হৃাসের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না, বরং এ ক্ষেত্রে একটা নতুন যে সমস্যা দেখা দিতে পারে- ধর্ষণের পর জন্য ভিকটিমকে হত্যার প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে। কারণ ভিকটিম যদি ধর্ষকদের চিনে ফেলে বা চিনে রাখে, সেক্ষেত্রে ফাঁসির হাত থেকে বাঁচার জন্য ধর্ষণের পর যে কোনোভাবে ধর্ষক ভিকটিমকে হত্যা করতে পারে।’

তিনি জানান, আসামি পক্ষের আইনজীবীদের দুর্নীতি, তদন্ত কর্মকর্তার দুর্নীতি, পুলিশ/সাক্ষীদের দুর্নীতি, বিচারকাজে অনিয়ম ইত্যাদি কারণে আদালতে ধর্ষণের মামলাগুলোর বিচারপ্রক্রিয়া এগোয় না।

‘ধর্ষণের মামলার তদন্তে  অনেকসময় ইচ্ছাকৃত ত্রুটি, অবহেলা থাকে। চিকিৎসকের পরীক্ষা ধর্ষকের মনে ধরিয়ে দেয় আরো আতঙ্ক। আর ধর্ষক যদি হয় প্রভাবশালী, তাহলে পুলিশি তদন্ত যায় ধর্ষকের পক্ষে। ধর্ষক ও ধর্ষিতা উভয়ই যদি দরিদ্র হয়, তাহলে তদন্ত প্রতিবেদন হয় দায়সারা, অন্তসারশূন্য।’

তিনি জানান, বিদ্যমান আইনে রূদ্ধদ্বার কক্ষে ধর্ষণ মামলার বিচারকার্য পরিচালনার বিধান থাকলেও অধিকাংশ বিচারকই তা মানতে উদাসীনতা প্রদর্শন করেন।

‘এরপর রয়েছে আসামি পক্ষের আইনজীবীদের জেরার বিষয়টি। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের ক্লায়েন্টদের বাঁচাতে এজলাসে ধর্ষিতাকে ভিকটিমকে এমন সব প্রশ্ন করেন, যে তাতে ওই ভিকটিমের দ্বিতীয়বার ধর্ষণের অনুভূতি হয়।’

কিছু পরিবর্তন আসছে : আইনমন্ত্রী : নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর সংশোধনের বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন,‘ সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড হলেও তা ধর্ষণ প্রতিরোধে সহায়ক হবে কি-না, এ ব্যাপারে যারা সন্দিহান তাদের উদ্দেশ্যে আমি বলবো, আমাদের উপমহাদেশের প্রেক্ষিতে এটা পরিক্ষীত সত্য যে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড হলে অপরাধ প্রবণতা কিছুটা হলেও কমে।’

ধর্ষণের মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়ার জটিলতা দূর করতে কিছু পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন,‘ বিচার প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তন আসছে। যখন এই আইনটি (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০) সংশোধণের বিষয়ে মন্ত্রীসভায় আলোচনা হয়, তখনই আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে কিছু পয়েন্ট উল্লেখ করেছিলাম এবং এগুলোতে তিনি সম্মতিও দিয়েছেন। আমার প্রথম পয়েন্টটি ছিল মামলাজটের বিষয়ে। এতদিন আদালত এবং ট্রাইব্যুনালগুলো অনেকটাই রুটিন ওয়ার্কের মতো কাজ করে আসছিল। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি, তিনি যেন প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে নিম্ন আদালতের বিচারকদের এই নির্দেশনা দেন যে তারা যেন সিকোয়েন্স ধরে ধরে ধারাবাহিকভাবে জমে থাকা মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করেন। চার্জশিটে যদি কোনো সমস্যা থাকে সেক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বিচারক জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারবেন। দ্বিতীয় পয়েন্ট হচ্ছে, ট্রাইব্যুনালগুলোর প্রসিকিউশন বিভাগকে শক্তিশালী করা।’

‘ধর্ষণের মামলার বিষয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ এভিডেন্স হলো ভিকটিমের জবানবন্দী ও মেডিকেল টেস্ট। এ দুটো যদি ঠিক থাকে তাহলে অনেক সাক্ষীর দায় থাকে না। মেডিকেল টেস্টের ক্ষেত্রে বলতে পারি, মামলার এভিডেন্স হিসেবে ডিএনএ টেস্টের ওপর জোর দেওয়া হবে, সে সঙ্গে বিতর্কিত টু ফিঙ্গার টেস্ট বাতিল করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৫৪ নাম্বার ধারার ৪ উপধারা (যেখানে বলা হয়েছে, আসামিপক্ষের আইনজীবী বাদি/ ভিকটিমকে যে কোনো প্রশ্ন করতে পারবেন) সংশোধনের পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে। এগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। আর সাক্ষীদের নিরাপত্তার যে প্রশ্নটি... কোনো মামলার সাক্ষী যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তিনি নিকটস্থ থানায় যদি যোগাযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে সহযোগীতা করবেন।’

যা বলছেন নারীনেত্রীরা : বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি এর আগেও মামলার সাজা হিসেবে যুক্ত ছিল। বিশেষ করে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় আসামির 
ফাঁসি হয়েছে এমন নজির বহু রয়েছে। তবে এবার এটি বিধিবদ্ধ আইন আকারে এসেছে-এটা অবশ্যই ইতিবাচক। এ ছাড়া একটি সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই আইন এসেছে-এটিও প্রশংসনীয়।

তবে শুধু শাস্তি ঘোষণাই যথেষ্ট নয়। অপরাধীকে চিহ্নিত করতে সাক্ষ্যের বিষয় আসে। ধর্ষণ মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় যারা সাক্ষী হিসেবে আদালতে আসেন, তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দীর্ঘদিন ধরে ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছি, কিন্তু তা আর আলোর মুখ দেখছে না।’

তিনি বলেন,‘ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে আমাদের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের সমাজে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ষণের শিকার নারীকে দোষারোপ করা হয় এবং ধর্ষককে বিভিন্ন ভাবে আশ্রয়/প্রশ্রয় দেওয়া হয়।  এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।’

নারী অধিকার আন্দোলন কর্মী এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘নিজেরা করি’ এর সমন্বয়ক খুশী কবির এ বিষয়ে বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন,‘আমাদের পরিসংখ্যান বলছে, ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশে মাত্র ৩% ধর্ষণ মামলার রায় হয়েছে, আর এর মধ্যে মাত্র .০৪% ক্ষেত্রে রায় ভিকটিমের পক্ষে গিয়েছে। আমাদের প্রচলিত আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে ধর্ষণ মামলার রায় দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও অধিকাংশক্ষেত্রে এই নির্দেশনা মানা হয় না।’

‘ধর্ষণ  মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রচুর সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, একটি ধর্ষণের মামলাকে বিচারক কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রায় সময়ই , রেপ করার সময় অভিযুক্ত ভিক্টিমকে শারীরিক ভাবে আঘাত করে। ফলে ধর্ষণ মামলা অনেক সময় হয়ে যায় শারিরীক আঘাত (ফিজিক্যাল অ্যাসাল্ট) মামলা। দ্বিতীয়ত, চার্জশিটে অনেকসময় ভুল তথ্য থাকে। থানায় যা বলা হয় তা চার্জশিটে লেখা হয় না। উদাহারণ হিসেবে বলতে পারি, সুবর্ণচর ধর্ষণের ঘটনা আমরা ফলো করছি। ওই মামলার ভিকটিম আমাদের জানিয়েছেন, তিনি মামলা করার সময় থানায় প্রধান আসামি হিসেবে যার নাম বলেছিলেন, আদালতে জমা পড়া চার্জশিটে তার নাম নেই। তৃতীয়ত, অধিকাংশ রেপ মামলার ক্ষেত্রেই সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখায় আসামি কিংবা আসামি পক্ষের লোকজন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ধর্ষণ মামলার সাক্ষীদের সুরক্ষা দেওয়ার বিধান রয়েছে এবং তা তারা মেনেও চলে, আমাদের দেশে নেই।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের বিচার প্রক্রিয়ায় যিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছে তাকেই প্রমাণ করতে হয় যে তার সঙ্গে ঘটনাটি ঘটেছে। আদালতে তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। এটা ন্যায়বিচার পরিপন্থী। রেপ ইজ রেপ অ্যান্ড ইট ইজ আ ক্রাইম। খুন যেমন একটি অপরাধ, রেপও তাই। বিচার প্রক্রিয়া এমন হওয়া প্রয়োজন যাতে ধর্ষণের শিকার যিনি হয়েছেন তাকে যেন সহানুভূতির সঙ্গে দেখা হয়, কোনোভাবেই হয়রানি পরিস্থিতির মধ্যে যেন তাকে না পড়তে হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এর মতো শুধুমাত্র ধর্ষণের মামলাগুলোর বিচারের জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল করা প্রয়োজন।’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এর নারী সেল শাখার নেত্রী এবং সিপিবি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য লুনা নূর এ বিষয়ে বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন, ‘সম্প্রতি দেশে ভয়াবহভাবে ধর্ষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় সরকার অনেকটা বাধ্য হয়েই মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে আইন সংশোধন করেছে। সাধারণভাবে এটা ইতিবাচক, কিন্তু যদি ন্যায়বিচারের প্রসঙ্গ আসে সেক্ষেত্রে আমাদের বিবেচনা করতে হবে ধর্ষণ এমন একটি অপরাধ যার ফলে একজন নারী শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে ক্ষত্রিগ্রস্ত হয় এবং এরপর যখন সে বিচার চাইতে যায়, তখন মেডিকেল টেস্ট থেকে শুরু করে প্রতিটি পর্যায়ে তাকে হয়রানির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এছাড়া দেশের প্রচলিত আইনে ধর্ষকের জামিনের বিধান না থাকলেও আইনের  নানা ধারা উপধারায় অনেকসময় আসামি জামিন পেয়ে যায়। তখন সে বিভিন্নভাবে ধর্ষণের শিকার নারী ও তার পরিবারকে হয়রানি করে। সংশোধিত আইনে কিন্তু এ বিষয়গুলোর ওপর কোনো আলোকপাত করা হয়নি।’

‘আমাদের দেশের নারী এবং নারী অধিকার সংশ্লিষ্ট আইনগুলো যথেষ্ট প্রগতিশীল ও নারীবান্ধব, কিন্তু সমস্যা হলো বাস্তব পরিস্থিতিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ আইগুলোর যথাযথ তো দূরের কথা, ন্যূনতম প্রয়োগও দেখা যায় না। আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হলে ন্যায়বিচার সম্ভব নয়।’ 

গণসংহতি আন্দোলণের পরিচালনা কমিটির সদস্য ও বিপ্লবী নারী সংহতির নেত্রী তাসলিমা আখতার বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন, ‘ধর্ষণ রোধ বা হৃাস করতে হলে আইন সংশোধন বা বিচারপ্রক্রিয়ার জটিলতা কাটানোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন। এটা সবার আগে প্রয়োজন। সম্প্রতি বাংলাদেশে যে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন চলছে, সেটি যথেষ্ট ইতিবাচক। ধর্ষণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ এই মাঠের লড়াই আরো দীর্ঘায়িত হওয়া প্রয়োজন। সর্বোপরি, নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখার যে সংস্কৃতি আমাদের সমাজে তৈরি হয়েছে তার পরিবর্তন প্রয়োজন।’ 

বাবু/প্রিন্স

 

 

এ জাতীয় আরো খবর

ধর্ষণ : সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কতদূর

ধর্ষণ : সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কতদূর

মাস্ক চুরিতে জড়িত বিমান ও কাস্টমসের ১০ কর্মকর্তা

মাস্ক চুরিতে জড়িত বিমান ও কাস্টমসের ১০ কর্মকর্তা

সড়ক-মহাসড়কে কৌশল পাল্টে সক্রিয় পরিবহন চাঁদাবাজরা

সড়ক-মহাসড়কে কৌশল পাল্টে সক্রিয় পরিবহন চাঁদাবাজরা

‘গুলশানের বাড়ি এবং ফরিদপুরের সামান্য সম্পদ ছাড়া কিছুই নেই মুসার’

‘গুলশানের বাড়ি এবং ফরিদপুরের সামান্য সম্পদ ছাড়া কিছুই নেই মুসার’

করোনা সঙ্কটে কারুনের প্রেতাত্মার তাণ্ডব

করোনা সঙ্কটে কারুনের প্রেতাত্মার তাণ্ডব

করোনা: স্বপ্নের দেশ, দুঃস্বপ্নের দেশ

করোনা: স্বপ্নের দেশ, দুঃস্বপ্নের দেশ