ঢাকা, শনিবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২১ ই-পেপার

টেলিমেডিসিনে আশার আলো

সোনিয়া আক্তার আমেনা :

২০২০-১২-০৪ ২২:১৪:২৪ /

স্বাভাবিক সময়ে ঘরে বসে ডাক্তার দেখানোর কথা ভাবতেই পারেননি অনেকে। করোনা বদলে দিলো সেই চিত্র। এখন দূরের গ্রামে বসেও দেখানো যাচ্ছে ঢাকার ডাক্তার। সরাসরি ডাক্তারের সঙ্গে ভিডিও কল বা তৃতীয় কোনও প্রতিষ্ঠানের অ্যাপের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে এ সেবা। ক্রমে বড় হচ্ছে দেশের টেলিমেডিসিন বাজার।

অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের ফেসবুক মেসেঞ্জারেও চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে ডাক্তারের পরামর্শ পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। অনেক চিকিৎসক নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে রোগীদের সেবা দিচ্ছেন ভয়েস ও ভিডিও কলে।  হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, ভাইবার ব্যবহার করেও রোগী দেখার কথা জানা গেছে।
করোনা সংক্রমণে সঙ্কট তৈরি হয় রোগীদের চিকিৎসা সেবা ও পরামর্শ পাওয়া নিয়ে।  তখন টেলিমেডিসিন প্রযুক্তি এগিয়ে আসে। দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান টেলিমেডিসিন সেবা দিচ্ছিল।  করোনাকালে তাদের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়।  সরকারও উদ্যোগী হয়ে আরও বড় পরিসরে টেলিমেডিসিন সেবা দিতে শুরু করে।  

জানা গেছে, দেশে এখন ৩০টির বেশি প্রতিষ্ঠান টেলিমেডিসিন সেবা দিচ্ছে।  এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সরকারের স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩, লাইফস্প্রিং, অর্ক হেলথ লিমিটেড, সিনেসিস হেলথ, টনিক, ডিজিটাল হেলথ, প্রাভাহেলথ ইত্যাদি।  এরমধ্যে স্বাস্থ্য বাতায়ন ২০১৫ সাল থেকে সেবা দিচ্ছে।  করোনাকালে সেবাগ্রহণকারী গ্রাহক বেড়ে যায়।  এখন প্রতিদিন এই কলসেন্টারে কলের সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি। 

দেশে টেলিমেডিসিন সেবা প্রদানকারীদের তালিকায় এগিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হলো লাইফস্প্রিং। প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে জানা যায়, করোনাকালীন টেলিমেডিসিন সেবার একটি বড় উত্থান দেখা যায়। এ সময় জরুরি নয় এমন কিছু স্বাস্থ্য সেবা যেমন- মানসিক স্বাস্থ্য সেবা, যৌন স্বাস্থ্য বা কোনও ধরনের আসক্তিজনিত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে মানুষ টেলিমিডিসিন সেবাকেই বেছে নিয়েছে। 

প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা জানান, টেলিমিডিসিন সেবা গ্রহণে মানুষের আগ্রহী হওয়ার আরেকটি বড় কারণ এতে ব্যক্তিগত তথ্যও সুরক্ষিত থাকে। এই ব্যবস্থা শুরু হওয়ার আগে যেসব রোগের ক্ষেত্রে শতকরা ৯০ শতাংশ রোগী স্বশরীরে হাজির হয়ে সেবা নিতেন, সেখানে এখন ৮০ ভাগ রোগীই অনলাইনে সেবা নিচ্ছেন। লাইফস্প্রিং-এর প্রধান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সাইয়েদুল আশরাফ কুশল বলেন, ‘লাইফস্প্রিংয়ে আমরা হাইব্রিড ব্যবস্থা চালু করেছি।  এই ব্যবস্থায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার চেম্বারে উপস্থিত থাকেন এবং রোগীরা চাইলে অনলাইনে চেম্বারে যোগ দিতে পারবেন। আমরা দেখেছি যে, ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে প্রায় ৮০ শতাংশ রোগী বাসায় বসে অনলাইনে সেবা নিতে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া আমরা দেখেছি যে গাইনোকোলজি, ডার্মাটোলজি ও পেডিয়াট্রিকস-এর কিছু কিছু ফলোআপ সেশন অনলাইনেই দেওয়া সম্ভব। কিন্তু যখন প্রয়োজন হয় তখন সেন্টারে আমাদের ডাক্তাররা উপস্থিত থাকেন, তারা তখন এসেও সেবা নিতে পারেন।’

লাইফস্প্রিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইয়াহিয়া আমিনের মতে, ‘আমাদের ৩০ শতাংশ রোগী আছে যারা এখন দেশের বাইরে। ভারত, ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশ থেকে অনলাইনে তারা ডাক্তারের পরামর্শ নিচ্ছেন। ভারতে বসবাসরত অনেক মানুষই লাইফস্প্রিং থেকে নিয়মিত সেবা নিচ্ছে।  ইন্টারনাল মেডিসিন, ডার্মাটোলজি, পেডিয়াট্রিক, সাইকিয়াট্রি ও সাইকোলজি, সেক্সুয়াল হেলথ মেডিসিন, গাইনোকোলজি ইত্যাদি সেবা  দিয়ে যাচ্ছে।  অনেকসময় দেখা যায় রোগীর মধ্যে সশরীরে আসতে হীনমন্যতা বা ইতস্ততা কাজ করে, সেক্ষেত্রে তারা অনলাইনে গোপনীয়তা রক্ষা করে সেবা নিতে পারছেন।’

টেলিমেডিসিন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান অর্ক লিমিটেড সামাজিক সেবা কার্যক্রমের আওতায় করোনা দুর্যোগকালীন কয়েক হাজার রোগীকে অর্ক অ্যাপ ব্যবহার করে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার পরামর্শ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সূত্রে জানা গেছে, অর্ক অল অ্যাপে যেকোনও মুহূর্তে সরাসরি অভিজ্ঞ ডাক্তারের সঙ্গে চ্যাট করে, ভয়েস বা ভিডিও কলে কথা বলে প্রাথমিক পরামর্শ নেওয়া এবং সরাসরি ডাক্তার দেখানোর জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।  এ ছাড়া বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক টেস্ট রিপোর্ট আপলোড করা, একই ডাক্তারের ফলোআপ কনলাটেশনসহ স্বাস্থ্যসেবার ওয়ান স্টপ সললিউশন সেবা দেয়।  প্রতিষ্ঠানটিতে ডাক্তারের পরামর্শ সম্পূর্ণ ফ্রি। বর্তমানে অর্ক অ্যাপে নিবন্ধিত ডাক্তারের সংখ্যা সহস্রাধিক। 

অর্ক’র সেবা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. শামীম খান বলেন, গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসকের অপর্যাপ্ততা ও প্রান্তিক মানুষের সামর্থ্যের কথা বিবেচনায় নিয়ে টেলিমেডিসিন সেবার এই উদ্যোগ। এখন যোগ্যতাসম্পন্ন চিকিৎসকরা গ্রামীণ রোগীদের ইন্টারনেটের মাধ্যমে কথা বলে ও ভিডিও দেখে পরামর্শ দিতে পারছেন। ‘স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজ করে দেশের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য’, বলেন ডা. শামীম খান। 

সরকারের স্বাস্থ্যবাতায়নের কলসেন্টার দেখভাল করে সিনেসিস হেল্থ।  প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, করোনাকালে স্বাস্থ্যবাতায়ন থেকে (৮ মার্চ থেকে ২৭ নভেম্বর) ১ কোটি ৫ লাখের বেশি মানুষকে সেবা প্রদান করা হয়েছে।  এ ছাড়া করোনার জন্য বিশেষায়িত কোভিড-১৯ টেলিহেলথ সেন্টার থেকে ডক্টর অ্যাসেসমেন্ট করা হয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ১৪৩ জনকে,  ফলোআপ করা হয়ছে ২ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৫ জন এবং ইনবাউন্ড হেলথ অ্যাডভাইসরি সার্ভিস দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ২০২ জন রোগীকে। এ ছাড়া মা-টেলিহেলথ সেন্টার থেকে এ পর্যন্ত ২ লাখ ৯৬ হাজার ৩৭০ মা ও শিশুকে সেবা প্রদান করা হয়েছে।  তিনি জানান,  তার প্রতিষ্ঠান সব স্তরের মানুষের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে যা উপরে উল্লিথিক সংখ্যা দিয়ে বোঝা যায়।  তিনি আরও জানান, তাদের সেবা মানবিক সেবা হিসেবে সবার কাছে গৃহীত হয়েছে।

এ বিষয়ে সফটওয়্যার ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বেসিসের সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, ‘এর বড় লাভ হলো গ্রামে বসেও একজন রোগী রাজধানীর বড় কোনও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারছেন। রোগীর ভোগান্তি ও খরচ কমছে।’

বেসিস সভাপতি বলেন, ‘টেলিমেডিসিন সেবার পরিসর আরও বাড়বে। বড় বড় হাসপাতালগুলো এ সেবা চালু করেছে। তবে সাফল্য পেতে হলে কম দামে দ্রুতগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে হবে। এটা করা না গেলে ভিডিও কনফারেন্সিং ব্যয়বহুল হয়ে যাবে। মোবাইল ডাটায় বেশি খরচ হয়ে গেলে রোগী আর ওপথে যেতে চাইবে না।’ 

টেলিমেডিসিন সেবাকেন্দ্রীক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বেসিস সভাপতি বলেন, ‘গ্রাহকের সব তথ্য আপনাদের কাছে। এসব তথ্য কোথাও না কোথাও আপনারা সংরক্ষণ করছেন। এসব তথ্য সাবধানে রাখতে হবে। প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, তথ্য যেন বেহাত না হয়।’

টেলিমিডিসিনের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, ‘এখন প্রত্যেক হাসপাতালের উচিত হাইব্রিড ব্যবস্থায় চলে যাওয়া। বাংলাদেশে টেলিমিডিসিনের বাজার প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার। প্রতিদিন ১৫ হাজারের বেশি রোগী টেলিমিডিসিন সেবা নিচ্ছেন। এর মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশীদের সেবা প্রদানেরও দ্বার উন্মোচিত হবে।’

টেলিমেডিসিন সেবার বিষয়ে জানতে চাইলে আইসিটি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘জাতীয় হেল্পলাইন ৩৩৩-১ নম্বরে দেশের নাগরিকদের কাছ থেকে শুধু করোনা সম্পর্কিত প্রায় ৩৯ লাখ কল গ্রহণ করা হয়েছে।  নাগরিকরা ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সেবা পেতে ১ চেপে মেন্যুতে প্রবেশ করে ঘরে বসেই নিরাপদে অভিজ্ঞ ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারছেন।  ইতোমধ্যে টেলিমেডিসিন সেবা পেতে এই হেল্পলাইনে ২২ লাখ ৪৬ হাজারেরও অধিক কলের মাধ্যমে নাগরিকরা সেবা গ্রহণ করেছেন।’ এছাড়া সরকারের আরও অন্যান্য উদ্যোগের মাধ্যমেও নাগরিকরা টেলিমেডিসিন সেবা পেয়েছেন বলে তিনি জানান।

বাবু/প্রিন্স

এ জাতীয় আরো খবর

বিআইপি অ্যাপের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণ

বিআইপি অ্যাপের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণ

একবছরে ইন্টারনেট সংযোগ বৃদ্ধি এক কোটি

একবছরে ইন্টারনেট সংযোগ বৃদ্ধি এক কোটি

যেভাবে ব্যাবহার করতে হবে ‘সবার ঢাকা’ অ্যাপ

যেভাবে ব্যাবহার করতে হবে ‘সবার ঢাকা’ অ্যাপ

বাজারে এলো সিম্ফনি জেড৩০ প্রো

বাজারে এলো সিম্ফনি জেড৩০ প্রো

কী করছেন, কোথায় যাচ্ছেন? সবই জানবে হোয়াটসঅ্যাপ

কী করছেন, কোথায় যাচ্ছেন? সবই জানবে হোয়াটসঅ্যাপ

গুগল থেকে সরানো হলো পার্লার অ্যাপ

গুগল থেকে সরানো হলো পার্লার অ্যাপ