ঢাকা, রবিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২১ ই-পেপার

ঘুষ অসাধ্য সাধনের একটি মুখপাত্র

রুদ্র শাহীন

২০২০-১২-১৮ ২১:৩৭:৫৮ /

১৯৭১ সাল। প্রায় ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল। ঠাঁই করে নিয়েছিল বিশ্বের মানচিত্রে। পেয়েছিল মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সম্মান। সেই দিন হতে আগামী ২০২১ সালে এসে দেশের বয়স দাঁড়াবে অর্ধশতাদ্ধিতে। 
 
কিন্তু বয়সন্ধিক্ষণে এসে দেশের উন্নয়ণ ধারার সূচকে এখনও উর্ধগতিতে রয়েছে ঘুষ এবং ঘুষখোর। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। সবখানে ঘুষ। যাহা করোনাভাইরাস, স্প্যানিশ ইনফ্লুঞ্জ কিংবা দুর্ভিক্ষর চেয়ে বহু বেশি ভয়ানক। 
 
দেশের শির খ্যাত সংসদ ভবন হতে শুরু করে দপ্তর, কার্যালয়, আইন -আদালত, কারাগার এমন কি কৃর্ষিখামার পর্যন্ত  সবখানে বাহাল তবিয়তে চলছে ঘুষ। এমন কোনো দপ্তর নেই ঘুষ ব্যতীত কার্যসাধন হয়। 
 
সরকার বা আইনের বেড়াজালে ঘুষ দমন করা কিছুতেই সম্ভব হচ্ছেনা। বরং কালের পরিক্রমে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অচিরেই এই দেশের নাম প্রকাশ পাবে- ঘুষ বাংলাদেশ। যেহেতু ঘুষ আমাদের দেশের জন্য অসাধ্য সাধনের একটি মুখপাত্র।
 
ঘুষ নিয়ে প্রথমে পাসপোর্ট অফিসের অভিজ্ঞতা থেকে লিখছি। ১৯৮৯ সালের কথা। হঠাৎ নেশায় ধরছে  বিদেশে পাড়ি দেবো। প্রয়োজন পাসপোর্ট। তাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ছুটে গেলাম পাসপোর্ট অফিসে। 
 
চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানার অনতিদূরে অফিসটি। এখনও আছে। দ্বিতীয় তলার একটা জনাকীর্ণ ভবন। নিচতলার সামনে টিন সেটের ছাউনি। 
 
ওখানে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্যক মানুষ। সবার হাতে হাতে কাগজের ফাইল-পত্র। আমিও লাইনে দাঁড়াইলাম। কিন্তু কাজ হলনা। সবার ফাইল জমা নিয়েছে। আমার ফাইলটিতে কোনো ঠোকেন চিহ্ন না দেখে ফিরিয়ে দিল। বললো- ‘ভুল আছে, কারো সাহায্য নাও।’ 
 
আমার পাশে খুঁঠি ধরে দাঁড়িয়ে আছে মধ্যবয়সি এক যুবক। বাংলা সিনেমার ভিলেনদের মত সিগ্রেট খাওয়ার ফ্যাশন। তিনি আমাকে দেখে ঠোঁটের আড়ালে হাসি দিয়ে বললো, ‘ভাই কোনো কাজ হবে না। যতই ঘষামাজা করোনা কেনো। তুমি বরং সাবের’ দার কাছে যাও। লোকটা খুব ভাল।’
 
সাবের’ দা কে? হাত উঠিয়ে তিনি বললেন, ‘ঐতো বাদাম তলে দাঁড়িয়ে আছে। এখানকার নামকরা দালাল।’ পাসপোর্ট অফিসের বাহিরে ছোট একটা বাদাম গাছ। দেখতে বয়স্ক বয়স্ক ভাব । তার নিছে বয়স্ক একজন মানুষকে ঘিরে আছে অনেক মানুষ। সবার হাতে কাগজের ফাইল-পত্র। দেখে মনে হল বই মেলার স্মৃতি। 
 
বাংলা  সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন ,জাফর ইকবাল কিংবা আনিসুল হকদের মত জনপ্রিয় লেখককে  এভাবে ঘিরে ধরে। পাঠক-ভক্তরা অটোগ্রাফ নিয়ে থাকে।
 
সাবের’দা একজন জনপ্রিয় পাসপোর্ট দালাল। তার কাছে মানুষ ছুটে। আমিও  গেলাম, পরক্ষণে ফাইল-পত্র জমা দিতে পারলাম। সপ্তাহ খানেকের মাথায় পাসর্পোটও পেয়ে গেলাম। কি আশ্চার্য বিষয় ! 
 
জানতে চাইলে সাবের’দা পুরা -১২০০ টাকার হিসাব দিলেন । সোনালী ব্যাংকের ফি-৩৫০ টাকা, জমা টোকেন (ঘুষ) প্রতি ফাইলে -৪০০ টাকা, সমিতির চাঁদা ১০০ টাকা, এবং ফাইল-পত্র সত্যায়িত খরচ বাবদ ৫০ টাকা, পুলিশ প্রতিবেদন ফি ২০০ টাকা। সর্বমোট ব্যয় হয় ১১০০ টাকা। অবশিষ্ট ১০০ টাকা দালাল নামের মানুষটির হাতে থাকে। 
 
উল্লেখ থাকে যে, সোনালী ব্যাংকের ৩৫০ টাকা ফি ব্যতীত বাকি সব টাকা ঘুষখোরদের পেঠে হজম হয়। সেই ধারাবাহিকতায় আজ ২০২০ সাল। অর্থাৎ দীর্ঘ ৩১ বৎসর পরের চিত্র। আগের মত দালাল আর নেই। ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়না। ভাবলাম- সম্ভবত দালালমুক্ত হয়েছে দেশ। ঘুষ নাম হয়ত মুছে গিয়েছে। 
 
দেশ আধুনিকায়ন হয়েছে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে পাসপোর্ট জমা দেবো আর নেবো। যেহেতু রঙ্গিন টিভির পর্দায় দেখলাম- এক ফটকে পাসপোর্ট আবেদন জমা হচ্ছে আর বিপরীত ফটকে পাসপোর্ট ডেলিভারি হচ্ছে। বাহ! চমৎকার। দেখে খুশিতে আটখানা আমি। 
 
যখন ফাইল নিয়ে আধুনিক কারুকাজে গঠিত ডিজিটাল পাসপোর্ট অফিসে গেলাম, দেখলাম আগের চিত্রের চেয়ে বহুগুণ ভয়াবহ। জমা করার কোনো সুযোগই নেই।  নব্য প্রজন্ম সুমন নামের এক দালালের সাহায্য নিলাম। দালাল ধরার পর ঠিক আগের মত ফাইল জমা হয়ে গেল। ডেলিভারির জন্য অপেক্ষা। 
 
জানতে চাইলে সুমন আমাকে পুরা হিসাবটা লিখে দিলো। সোনালী ব্যাংকের ফি ৩৪৫০ টাকা, জমা টোকেন (ঘুষ)  ১২০০ টাকা, ঢাকার আগারগাঁও অফিসে বিকাশ করতে হবে ২০০০ টাকা, পুলিশ প্রতিবেদন ৬০০ টাকা ও সমিতির চাঁদা ১০০ টাকা। বাকি শ’খানেক টাকা যায় দালালের পকেটে। ঠিক আগের চিত্রের মত। এখানে সোনালী ব্যাংকের ৩৪৫০টাকা ব্যতীত বাকি সব টাকা ঘুষ। এই ঘুষ ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের পাসর্পোট পাওয়ার কোনো আশা নেই। 
 
পর্যালোচনায় দেখা গেলো, ডিজিটাল হয়েছে বাংলাদেশ আর এই ঘুষ বিনিময় হয় ডিজিটাল পদ্ধতিতে। ঘুষের বর্ণনায় শুধু পাসপোর্ট অফিস সীমাবদ্দ নয়। দেশের এমন কোনো সেক্টর নেই ঘুষ চলেনা। 
 
সরকারি, বেসরকারি, ব্যাংক-বীমা, আইন-আদালত, প্রশাসন, ডাক, হাসপাতাল হতে শুরু করে প্রতিটি স্থানে ঘুষ। এমন অবস্থা ঘুষ ব্যতীত কোনো কার্য সিদ্দি হবেনা বা হতে পারেনা। 
 
অথচ প্রতিটি ঘুষখোর সরকারে বিশাল অংকের বেতনভুক্ত। তারপরও তাদের শেষ গতিসীমা ঘুষ। 
 
এরজন্য সমস্ত ভোগান্তি সাধারণ মানুষের উপর। দেখা যায়, ঘুষ না হলে মর্গে স্বজনের লাশও ডেলিভারি হয় না। ঘুষ আর ঘুষ। অচিরে এদেশ কোন দিকে পৌঁছে একমাত্র সময় বলে দিবে।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক
 
বাবু/জেআর
 

এ জাতীয় আরো খবর

আকস্মিক রাজনীতিবিদ সৈয়দ আশরাফ

আকস্মিক রাজনীতিবিদ সৈয়দ আশরাফ

ঘুষ অসাধ্য সাধনের একটি মুখপাত্র

ঘুষ অসাধ্য সাধনের একটি মুখপাত্র

বাঙালি সত্তাই বাঙালি জাতির মূলমন্ত্র

বাঙালি সত্তাই বাঙালি জাতির মূলমন্ত্র

উন্নয়নের স্রোতধারায় বদলে যাওয়া এক নগরী

উন্নয়নের স্রোতধারায় বদলে যাওয়া এক নগরী

দূরবীনে দূরের জানালা

দূরবীনে দূরের জানালা

করোনারোধে ঢাকার ৪৯ এলাকা লকডাউন হচ্ছে

করোনারোধে ঢাকার ৪৯ এলাকা লকডাউন হচ্ছে