ঢাকা, শুক্রবার, ৫ মার্চ ২০২১ ই-পেপার

নীতি-নৈতিকতা ও বাঙালির রীতিনীতি

রাশিদুল রাশেদ - কবি, লেখক ও রাজনীতিক

২০২১-০২-১০ ১৯:০৭:৫৯ /

মানুষের বংশের কোনো পরিচয় থাকতে নেই। প্রকৃতিগতভাবে সবাই যেহেতু মানুষ, সেক্ষেত্রে তার আলাদা আলাদা বংশ পরিচয়ের কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। এমনকি রাজা, উজির, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, সাহিত্যিক, কবি, শিল্পী, অভিনেতা, নেতাসহ কারোরই আলাদা বংশের কৃতী হওয়ার কোনো বিধান থাকতে নেই।

কেননা মানুষ শুধু মানুষ! একমাত্র মানবতা হলো আসল গুণ বা চরিত্র এবং এই গুণ ও চরিত্রকে নৈতিকতার মাধ্যমে পরিচালনা করতে হয়। নীতি-নৈতিকতা বিহীন মানবতা গুণ নষ্ট হতে পারে। নীতি-নৈতিকতা বোধের জাগরণে মানুষ নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে মানুষ নামের বংশের।  তাই মানুষ সবাই একই বংশের! আর সে বংশের নাম মানুষ!

প্রচলিত মতবিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে অনেক সময় মানুষ নিজেকে সভ্যতার সেরা প্রাণী হিসেবে দাবি করে থাকে বটে। আজ অবধি এই দাবির যথার্থতা বোঝাতে পারেনি কোন মানুষ। কেননা মানুষ সামান্য কিছু একটা স্বার্থ সংশ্লিষ্টতায় বিদ্যুৎ গতির ন্যায় যেভাবে কাজ করে তার নিজের ভেতর, সেভাবে সে নিজেকে কিভাবে সভ্যতার সেরা প্রাণী দাবি করে! তা আমার বোধগম্য হয় না। অর্থাৎ একজন স্বার্থপর প্রাণী যদি এরকম দাবি করে তাহলে বরং নিজেকে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে থাকে বটে। এই অপরাধ সে যুগ যুগ ধরে অযাচিত এবং অযৌক্তিক করে যাচ্ছে। গণ্ডমূর্খ মানুষ নেয় শুধু, এমনকি বহু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিত মানুষ পর্যন্ত এই অশোভন মন্তব্যের মাধ্যমে নিজেকে গর্বিত করে থাকে। যেটা একেবারে মানানসই নয়। আচরণে, চিন্তায়, চৈতন্যে, মনোবিকাশে, বুদ্ধিচাতুর্যে কত ধরনের অশোভন ও অনৈতিক চরিত্রে দেখা যায় তাকে! অথচ নিজেকে সে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ প্রাণী বলে মনে করে! আসলে এ দাবি হলো মানুষের জন্য এক বিরাট শুভঙ্করের ফাঁকি। কেননা সে বংশের কৃতী অহংকারের ও শ্রেষ্ঠ প্রাণীর তকমা লাগিয়ে নিজেকে অহেতুক ও অযৌক্তিক আচরণের অভিযোগ তুলে ধরে থাকে বটে।

আমরা লক্ষ্য করতে পারি, সিদ্ধার্থ গৌতম জীবনী পড়লে যে, রাজার সন্তান হয়েও রাজদরবারের ভেতর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত না করে মানুষ নামক প্রাণীর দুঃখ দুর্দশা বিদূরিত বা লাঘবের আশংকায় সে নির্দ্বিধায় রাজদরবার পরিত্যাগ করে একটি নীতি দর্শন প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ‘অহিংসা পরম ধর্ম’ এবং এই দর্শনের মুখাপেক্ষিতা হয়ে বরণ করেছে আজো শত শত কোটি মানুষ। থাকতে পারে সমালোচনা এই দর্শনের। কিন্তু মানুষ হিসেবে বংশীয় অহংকার নেই, হিংসা নেই, দ্বেষরোষ নেই।

বংশের কৃতী গৌরবে অধিষ্ঠিত কিছু কিছু মানুষ অন্য মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করতে সদা সচেষ্ট। যা যৌক্তিক আলোচনার ভিত্তিতে কোনভাবেই মডারেট নয়, বরং যথেষ্ট গোঁড়ামিতে পূর্ণ। আর মডারেশনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত নয় এমন কিছু কিভাবে গৌরবের পর্যায়ে পড়ে, তা আমার কোনভাবেই বোধগম্য হয় না। সমস্ত পৃথিবী জুড়ে বংশের কৃতীর গৌরবে অধিষ্ঠিত হয়ে অন্য মানুষকে মনুষ্যত্ব বিকাশের সুযোগ বন্ধ্যা করে দেয় কিছু মানুষ। যেটাকে হলফ করে বলা যায় যে, নিরেট মূর্খতা। আর মূর্খের ঔদ্ধত্য ভাব বা চিন্তা নিয়ে কিভাবে মানুষ গৌরব চিহ্ন আঁকে! তা রীতিমতো একটা মারাত্মক অন্যায় ও অপরাধ। এই অপরাধ কার্যক্রমের জন্য আজো আধুনিক যুগে শত শত কোটি মানুষ মনুষ্যত্বের বিকাশ না ঘটিয়ে চুপচাপ জীবন অতিবাহিত করে যাচ্ছে।

যদিও বংশের নামে কিছু কিছু  মানুষ চিরকাল অন্য মানুষকে অপমান, অপদস্ত, হেয় প্রতিপন্ন করে যায় বা যাচ্ছে। তবে সেটা সম্পূর্ণ অমূলক ও অনৈতিক। কেননা একই রক্তমাংসের গড়া প্রাণী হওয়া স্বত্বেও সে বংশের গৌরব চিহ্ন আঁকবে কেন? এবং তা কোনভাবেই উচিত নয়। বরং যারা বংশের নামে এমন আচরণ করে, তারা নিতান্তই মূর্খ আচরণ করে। এজন্য হয়তো মনীষীরা বলে থাকেন- ‘বংশের গৌরব মূর্খতা।’ মূর্খের ঔদ্ধত্য আচরণে আজও মানুষ মানুষের কাছে চরম অসহায়।

মানুষের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, মানুষের মুক্তচিন্তা চর্চায় সুযোগ প্রদান করা, মানুষ বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা, মানুষের সৃজনশীলতা বিকাশের পথ উন্মুক্ত করা, মানুষের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দাবি বটে। এসব নৈতিক দাবিকে অগ্রাহ্য করার কোন সুযোগ নেই, অন্তত আধুনিক এ যুগে। কিন্তু যদি বংশের নাম করে উপরোক্ত বিষয়গুলো পরিহার করা হয়ে থাকে, তবে তা সম্পুর্ন অমূলক ও অনৈতিক কর্মকান্ডের পর্যায়ে পড়ে। তবুও অনেক সময় দেখা যায় যে, মানুষ বংশের কৃতী গৌরব করে থাকে এবং বংশের গৌরবে অহংকার করে থাকে। যদিও তা সম্পুর্ন অমূলক, অনৈতিক ও কপটচারী চরিত্রের পর্যায়েরও বটে।

এই বংশের নাম করে আধুনিক পৃথিবীতে মানুষ মানুষকে দাস বানিয়ে রেখেছে এবং এইভাবে মানুষ মানুষকে নিত্য ছিবড়ে ছিবড়ে খাচ্ছে। অতীতেও এমন অমূলক কার্যক্রম অহরহ হয়েছে, যেখানে বিচার-বিবেচনা, নৈতিকতা কখনোই অনুসরণ করা হয়নি। তবে ন্যূনতম কোন ধরনের লজ্জাবোধ হয়না ঐসব মানুষদের, যারা এখনো বংশের নামে বড়াই করে, অহংকার করে, হিংসা করে, দ্বেষ রোষ ছড়ায়। অবশ্য এসব না-হওয়ার চাক্ষুষ রীতি অনুসৃত হয় যে, এই বংশের নামে অহংকার করার মাধ্যমে তারা নিজেদের কপটতা পোষণ করেন এবং নিজের অমূলক সুযোগগুলো অন্যায়ভাবে উপভোগ করেন, একেবারে লজ্জাহীনদের মতো করে। অসভ্য বুনো জানোয়ার যেমনটি করে থাকে।

আজ অবধি যদিও বংশের নামে কিংবা বংশের গৌরবে অধিষ্ঠিত হয়ে কোন প্রতিভা, সৃজনশীলতা বিকাশ হতে দেখা যায়নি। বংশের ধারাবাহিকতায় কোন দর্শন শাস্ত্র, সাহিত্য সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কোনকিছুর বিকাশ ঘটেছে বলে দেখা যায় নাই। সেজন্য থেলিস, সক্রেটিসের বংশধরদের দার্শনিক হতে দেখা যায়নি, লিওনার্দো ভিঞ্চি, পাবলো পিকাসো, জয়নুল আবেদীনের বংশধরদের চিত্রকর হতে দেখা যায়নি, আর্কিমিডিস, আলবার্ট আইনস্টাইনের বংশধরদের পদার্থবিদ হতে দেখা যায়নি, শেলি, দান্তে, শেক্সপিয়ার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বংশধরদের কবি, সাহিত্যিক হতে দেখা যায়নি। অর্থাৎ এটাই বরং প্রমাণিত বংশের কোনো কৃতী নেই, কোনো গৌরব নেই। বরং প্রতিভাবান শিল্পী, রাজর্ষী, দাসগুপ্ত যে-ই হোক না কেনো, সব ব্যক্তি উদ্যোগে, ব্যক্তি প্রচেষ্টার মাধ্যমে হতে হয়।

যদি মানুষ নীতিনৈতিকতা আন্তরিকভাবে পোষণ করে থাকতো, তাহলে বংশের নামে কোনো ধরনের কপটতা করতে সাহস করতো না। কেননা নৈতিকতা স্বার্থপরতার কারণে কপটচারী চরিত্র পোষণ করাতে সম্পুর্ণ নিষেধ করে থাকে। রাষ্ট্রীয় অহংকার, হিংসা, দ্বেষ, রোষ, কুচক্রী চরিত্র আজকের সভ্য পৃথিবীকে বাঁচাতে সক্ষম হচ্ছে না, ঐ একই কারণে। অতীতেও এমন হয়েছে। সারা পৃথিবী জুড়েই যে, যুদ্ধংদেহী মনোভাব পোষণ হচ্ছে, বীভৎসতার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। তারও মূল কারণ ঐ বংশীয় (রাষ্ট্রীয়) অহংকার। অনেক সময় লক্ষ্য করলেই দেখতে পাওয়া যায় যে, অহেতুক অহংকার পোষণের কবলে পড়ে এই ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধির হার বেড়েই চলেছে।

বাবু/ফাতেমা

এ জাতীয় আরো খবর

পাহাড় কাটা বন্ধ করুন

পাহাড় কাটা বন্ধ করুন

সংবাদ তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা ও গণমাধ্যম

সংবাদ তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা ও গণমাধ্যম

মশা নিয়ন্ত্রণে চাই সমন্বিত কার্যক্রম

মশা নিয়ন্ত্রণে চাই সমন্বিত কার্যক্রম

নিরাপদ হোক সাইবার জগৎ

নিরাপদ হোক সাইবার জগৎ

স্বাধীনতা ও স্বপ্নের বাংলাদেশ

স্বাধীনতা ও স্বপ্নের বাংলাদেশ

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ অধিকার থেকে বঞ্চিত কেন

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ অধিকার থেকে বঞ্চিত কেন