ঢাকা, শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২১ ই-পেপার

মাতৃভাষার স্বকীয়তা ফিরিয়ে আনতে হবে

রিদুয়ান ইসলাম,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

২০২১-০২-১৪ ১৭:১০:১১ /

চলছে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালে এমন দিনে বাংলার কিছু তরুণ যুবক বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করতে তাদের প্রাণ নিবেদিত করেছিলেন। তাঁদের সেই আত্মত্যাগেই আজ আমরা স্বাধীনভাবে বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে পারছি। কিন্তু বর্তমানে আমরা বাঙালি জাতিরাই আমাদের মায়ের ভাষাকে অপব্যবহার করছি। গর্বের সাথে বাংলা বলতে দ্বিধাবোধ করি। আড্ডামহলে বন্ধুদের সামনে মিশ্র ইংরেজিতে, স্টাইলিশ ভাবে কথা না বল্লে যেনো চলেই না! রক্তের বিনিময়ে কেনা বাংলা ভাষাকে অবমাননা করছি, বিকৃত করছি। এসব কি আমাদের মায়ের ভাষাকে অপমান করা নয়? আমাদের ভাইয়ের রক্তকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ভাবা নয়?

বাঙালি জাতির জীবনে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো মাতৃভাষা ‘বাংলা’। এই মাতৃভাষার জন্য ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত দফায় দফায় আন্দোলন এবং বিভিন্ন কর্মসূচি হয়েছে। যার চূড়ান্ত অবসান ঘটে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করতে বাংলার দামাল ছেলে রফিক, সালাম, বরকত, শফিউর, জব্বারসহ নাম না জানা অনেকেই অকাতরে তাঁদের প্রাণ উৎসর্গ করে দিয়েছে। ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিলো তাদের রক্তে। বিশ্বে বাঙালি জাতি ছাড়া আর কোনো জাতি তার মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এভাবে অকাতরে জীবন দেয়নি। আমাদের ভাইয়েরা দিয়েছে, রক্ষা করেছে মায়ের ভাষা। বাংলার বুকে প্রতিষ্ঠিত করেছে ‘বাংলা ভাষা’ কে মাতৃভাষা হিসেবে।

ফেব্রুয়ারি মাস এলেই ভাষার কথা মনে পড়ে তরুণ যুবসমাজের। পুষ্পস্তবক আর বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানায় ভাষা শহীদদের। ভাষার মাসে মনে করিয়ে দেয় সেইসব আত্মত্যাগী ভাইদের কথা যারা তাদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে আমাদের ‘বাংলা ভাষা’ রাষ্ট্রভাষা করে গিয়েছেন। যেখানে এই মাতৃভাষা তরুণদের অহংকার হওয়ার কথা সেখানে তাদের কাছেই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত এই মাতৃভাষা। বর্তমান সময়ে আমাদের অনেকে বাংলা ভাষাকে গর্বের সাথে ব্যবহারে সংকোচবোধ করে থাকে। অনেকের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব চলে এই নিয়ে। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষুদেবার্তায় বাংলার থেকে বেশি প্রাধান্য পেয়ে থাকে বাংলিশ। অর্থাৎ, এমন এক ভাষা যেটা বাংলাও নয় ইংরেজিও নয়। বাংলা ও ইংরেজির সংমিশ্রণে ভাষা বাংলিশ। শুদ্ধ বাংলায় বার্তা প্রেরণে মনে করে থাকে আনস্মার্ট, ক্ষ্যাত টাইমের কিছু।

এছাড়াও শহরাঞ্চলীয় ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তারা বাংলায় কথা বলতে পারে না। এটা নিয়েও অভিভাবকরা গর্ব করে থাকে তার সন্তান ইংরেজিতে কথা বলে। যেখানে ভাষার জন্য বীর বাঙালিরা লড়াই করে রক্ত দিয়েছে, সেখানে বাংলা বলতে হেয়বোধ মনে করছে। এসবের প্রধান অন্তরায় রয়েছে বাংলা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করা, সর্বমহলে বাংলার প্রাধান্য না পাওয়া, আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে সংকোচবোধ করা ইত্যাদি। দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যেই ভাষা ব্যবহারের সচেতনতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে দিনের সিংহভাগ সময় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খোশগল্পে সময় পার হচ্ছে। আর সেই খোশগল্পের ভাষ্য হয়ে থাকে বাংলাকে ইংরেজিতে লেখার মধ্য দিয়ে। যেটা বাংলা ভাষা মৌলিক অবক্ষয়ের প্রধান কারণ। এমনভাবে ভাষা ব্যবহারে সচেতন হয়ে মাতৃভাষায় স্বকীয়তা ফিরিয়ে আনতে হবে।

ভাষা ব্যবহারে সবার প্রথমেই সোচ্চার হতে হবে দেশের তরুণ প্রজন্মকে। একুশের চেতনায়, ভাষা আন্দোলনের মহিমায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে সকলকে। গর্ব আর অহংকারের মধ্য দিয়ে সর্বস্তরে আমাদের রক্তে অর্জিত বাংলা ভাষার বিস্তার ঘটাতে হবে। তরুণ প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষাকে প্রেমের নমুনা হিসেবে স্থাপন করতে হবে। বাংলা ভাষা ব্যবহারে তরুণদের আরো সচেতন হয়ে মাতৃভাষাকে বর্তমান সময়ের তারুণ্যের অহংকার হিসেবে জাতির কাছে তুলে ধরতে হবে। যে বাংলা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছিলো একঝাঁক তরুণ সেই বাংলা ভাষাকে ‘তরুণদেরই’ বিশ্বমঞ্চে অভিনবত্বের রুপে দাঁড় করাতে হবে। ভাষার মাসে এটাই মহান প্রত্যাশা বাংলা ভাষাকে যথার্থ সম্মান দিয়ে বিশ্বের বুকে তা আরো বহুগুণে সম্মৃদ্ধ করতে হবে।

বাবু/ফাতেমা

এ জাতীয় আরো খবর

স্বাধীনতা ও স্বপ্নের বাংলাদেশ

স্বাধীনতা ও স্বপ্নের বাংলাদেশ

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ অধিকার থেকে বঞ্চিত কেন

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ অধিকার থেকে বঞ্চিত কেন

শিশুর সামাজিকীকরণে পরিবেশ সন্তানবাদ

শিশুর সামাজিকীকরণে পরিবেশ সন্তানবাদ

এই দিনেই তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়া হয়েছিল

এই দিনেই তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়া হয়েছিল

বাংলা ভাষার সঠিক মর্যাদা চাই

বাংলা ভাষার সঠিক মর্যাদা চাই

বাংলা ভাষার দূষণ : কারণ ও প্রতিকার

বাংলা ভাষার দূষণ : কারণ ও প্রতিকার