ঢাকা, শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২১ ই-পেপার

বাংলা ভাষার দূষণ : কারণ ও প্রতিকার

মোঃ আকিব হোসাইন

২০২১-০২-১৮ ১৯:২১:৩৩ /

আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলা। আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কথা বলার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে থাকি। আমরা জন্মগ্রহণের পর সর্বপ্রথম মায়ের নিকট থেকে যে ভাষা শিক্ষার্জন করি সেটা হচ্ছে বাংলা ভাষা। এজন্য এ ভাষাকে মায়ের ভাষা বলে থাকি।

 আমরা আমাদের মনের ভাব অন্যের কাছে প্রকাশ করার জন্য এই ভাষা ব্যবহার করে থাকি। তাই বাংলা ভাষা খুবই সম্মানিত ভাষা হিসেবে সুপরিচিত। অতি তাৎপর্যযুক্ত কথা হচ্ছে এ ভাষা সহজে আমাদের নিকট আসেনি কিংবা সর্বজনিনতা লাভ করে নি। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ব্রিটিশ সরকার ভারত পাকিস্তান নামে দু’টি রাষ্ট্রে বিভক্ত করে দেওয়ার পর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন যদিও এ দেশের ৫৬ শতাংশ মানুষের নিকট বাংলা ভাষা ছিল প্রিয়। অন্যদিকে শতকরা ৭ শতাংশ মানুষের মুখের ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ষোষণা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করলেও এদেশের ছাত্র, শিক্ষক কিংবা আপামর জনসাধারণ এর চরম বিরোধিতা করেন। সেক্ষেত্রে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ভাষা আন্দোলনকেই প্রথম সংগ্রাম বলা যায়।

ভাষা আন্দোলনের ৬৯তম বর্ষে পদার্পণ করলেও অতি সাধারণভাবে লক্ষ করা যায় যে, এখনো বাংলা ভাষার পূর্ণ মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়নি কিংবা বাংলা ভাষার পূর্ণ প্রয়োগ করা সম্ভব হয় নি। ভাষার অপব্যবহার, বিকৃতিসহ আর অনেক কিছু দৃশ্যমান। বর্তমানে নানানভাবে ভাষা দূষিত হয়ে থাকে। আমাদের দেশে ভাষা দূষণের চিত্র অতি সহজভাবে দেখা যায়। তন্মধ্যে- দেশের সিংহভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম ইংরেজিতে লেখা, বিভিন্ন সরকারি কিংবা বেসরকারি অফিস-আদালত সমূহের ইংরেজি নামকরণ, রাস্তার পাশে কিংবা দোকানপাটের ইংরেজি নামকরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইংরেজি মাধ্যমে পাঠদান, দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ইংরেজি মাধ্যমেই পড়ানো হয়। যদি এদেশের উচ্চ আদালতের রায় ইংরেজি মাধ্যমে লেখা হয়। বিভিন্ন চাকরির ক্ষেত্রে ইংরেজিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়, বিভিন্ন প্রচার কিংবা বেতার পরিচালনার ক্ষেত্রে ইংরেজিতে কথাবার্তার মাধ্যমে শুরু করা হয় তাহলে বাংলা ভাষাকে ব্যবহারের পরিবর্তে অপব্যবহার করা হয় বলা যেতে পারে।

এখন প্রশ্নটা হলো তাহলে কি দরকার ছিল বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করতে? কী দরকার ছিল পাকিস্তানের সিংহভাগ লোকের মুখের ভাষাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে ভাষা শহীদদের জীবন উৎসর্গ করতে? কী দরকার ছিল রাজপথে মিছিল করার ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, আমাদের দাবি আমাদের দাবি, মানতে হবে মানতে হবে।’ তাছাড়া আমরা কথা বলার ক্ষেত্রে বাংলার সাথে দুই একটা ইংরেজি শব্দের উচ্চারণ করাটা দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করেছি। বিভিন্ন অফিস-আদালতের দৈনন্দিন কাজকর্ম ইংরেজিতে পরিচালনা করা হয়, ব্যাংকের সকল কার্যক্রম ইংরেজিতে পরিচালনা করা হয়, খুদে বার্তা প্রেরণ করার সময় কিংবা পরস্পর আলাপ-আলোচনায় ক্ষেত্রে বাংলার সাথে ইংরেজিকে মিশ্র করে উচ্চারণ করে থাকি। এটাকে আবার আমরা ‘বাংলিশ’ ভাষা নামে ডাকি। তবে এটা বেশিরভাগ আমাদের দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের মাঝে উপস্থিত। এগুলোকে কি ভাষা দূষণ বলা যায় না?

বাংলার সাথে ইংরেজি, হিন্দি, আরবি কিংবা উর্দুর সংমিশ্রণ করার মাধ্যমেও ভাষা দূষণ করা হয়। আবার কথা বলতে গিয়ে হায়, হ্যালো, হায় ভিউয়ার্স, গুড মর্নিং, গুড নাইট কিংবা কথা বলার সময় বন্ধু আমার একটা কোয়েশ্চন আছে। এখানে বাংলার সাথে ইংরেজি শব্দ কোয়েশ্চন এর সংমিশ্রণ হয়েছে। এভাবে আমরা নানান মাধ্যমে ভাষাকে দূষিত করে থাকি। আর এগুলোই হচ্ছে ভাষা দূষণ। আধুনিকতার নামে এরকম ( বাংলা সাথে ইংরেজি, হিন্দি, আরবি, ফারসি) শব্দের সংমিশ্রণ বাংলা ভাষাকে ব্যাপকভাবে দূষিত করেছে কিংবা বিকৃত করেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের বিজ্ঞাপন, নাটক, বা চলচ্চিত্রের মিশ্রিত ভাষার প্রয়োগে বাংলা ভাষাকে দূষিত করেছে। বাংলা ভাষার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে বলা যায়। বাংলা ভাষার দূষণ ও বিকৃতি রোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। ২০১৪ সালে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার আদেশ দেন। দেশে ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন-১৯৮৭’সহ অনেক সরকার বিধিনিষেধ বিদ্যমান। এইসব আদেশ, নির্দেশ কিংবা বিধিনিষেধ শুধু নামমাত্র কিন্তু বাস্তবে মোটেও প্রচলিত নয়। বাংলা ভাষার প্রতি আর যেন কোনো আঘাত না আসে সেই বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। এছাড়া বাংলা ভাষার দূষণ, বিকৃত উচ্চারণ, ভিন্ন সুরে বাংলা ভাষার কথন ইত্যাদি বিষয়গুলো পরিত্যাগ করতে হবে।

সর্বোপরি, বাংলা ভাষার দূষণ রোধ করার জন্য দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রমিত বাংলা ভাষা চর্চা কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি। সকল শিক্ষালয়ে প্রমিত বাংলা নামে একটা কোর্স চালু করতে হবে। পাশাপাশি দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রমিত বাংলা ভাষা নামে কোর্সের ব্যবস্থা করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে নানাভাবে ভাষাকে বিকৃত করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের সম্মেলনে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন। এটা হচ্ছে বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান আর ভালোবাসা। তাই আসুন ভাষার উপর্যুক্ত ব্যবহার করি, শুদ্ধ উচ্চারণ করি, শুদ্ধ ভাষায় সকল কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে ভাষাকে সম্মান করি। প্রিয় মাতৃভাষাকে ভালোবেসে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। কেননা তারা আমাদের গর্ব এবং অহংকার।

বাবু/ফাতেমা

এ জাতীয় আরো খবর

স্বাধীনতা ও স্বপ্নের বাংলাদেশ

স্বাধীনতা ও স্বপ্নের বাংলাদেশ

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ অধিকার থেকে বঞ্চিত কেন

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ অধিকার থেকে বঞ্চিত কেন

শিশুর সামাজিকীকরণে পরিবেশ সন্তানবাদ

শিশুর সামাজিকীকরণে পরিবেশ সন্তানবাদ

এই দিনেই তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়া হয়েছিল

এই দিনেই তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়া হয়েছিল

বাংলা ভাষার সঠিক মর্যাদা চাই

বাংলা ভাষার সঠিক মর্যাদা চাই

বাংলা ভাষার দূষণ : কারণ ও প্রতিকার

বাংলা ভাষার দূষণ : কারণ ও প্রতিকার