
X
ডিলার পয়েন্টগুলোতে কৃষকদের লাইন
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে আমন ধান চাষে রাসায়নিক সার প্রয়োগকে কেন্দ্র করে ডিলার পয়েন্টগুলোতে কৃষকদের তীব্র ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) ভোর থেকেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শত শত কৃষক সার পাওয়ার আশায় নাচোল সদরের বিসিআইসি ডিলারদের দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভিড় জমান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকালে সার পাওয়ার সুবিধার্থে ভোর থেকেই কৃষকরা ডিলারের দোকানের সামনে জমায়েত হতে শুরু করেন। একপর্যায়ে কৃষক সমাগম বেড়ে গেলে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কার সৃষ্টি হয়।
খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা কৃষি অফিস দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কৃষকরা শান্ত হয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান এবং সুশৃঙ্খলভাবে নিজেদের প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করেন।
কৃষি বিভাগ ও ডিলার সূত্রে জানা যায়, নাচোল উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা কৃষি অফিসের সার্বিক তদারকিতে সদরের ৫ জন ডিলারের মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে সরকারি নির্ধারিত ন্যায্যমূল্যে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ বস্তা ইউরিয়া, পটাস (এমওপি) ও ডিএপি সার বিক্রি করা হয়।
সার সরবরাহকারী ৫টি ডিলার প্রতিষ্ঠান হলো— নইমুদ্দিন বিশ্বাস, ওয়াদুদ এন্টারপ্রাইজ, সিরাজুল ট্রেডার্স, জামিরুল ট্রেডার্স এবং তৌহিদ অ্যান্ড ব্রাদার্স।
দীর্ঘ সময় রোদে পুড়ে ও লাইনে দাঁড়িয়ে ভোগান্তি পোহাতে হলেও শেষ পর্যন্ত সার হাতে পেয়ে কৃষকদের চোখে-মুখে স্বস্তির ছাপ দেখা যায়। তবে উপস্থিত বেশ কয়েকজন কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "মৌসুমের শুরুতেই যদি চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া যেত, তবে এভাবে ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে এত ভোগান্তি পোহাতে হতো না।"
ডিলাররা অভিযোগের বিষয়ে জানান, প্রতি মাসে কৃষি অফিসে যে পরিমাণ সারের চাহিদাপত্র জমা দেওয়া হয়, তার তুলনায় প্রাপ্ত বরাদ্দের পরিমাণ বেশ কম। চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত বরাদ্দ পাওয়া গেলে কৃষকদের সার সংগ্রহে কোনো ধরনের জটিলতা বা ভোগান্তি থাকবে না।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার সলেহ্ আকরাম বলেন, চাহিদার তুলনায় কেন্দ্রীয়ভাবে বরাদ্দ কিছুটা কম পাওয়ায় সাময়িক এক ধরণের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল। তবে আজকে বিক্রির মাধ্যমে এলাকার সিংহভাগ কৃষকের চাহিদাই পূরণ সম্ভব হয়েছে। আশা করছি আগামী সপ্তাহেই অবশিষ্ট প্রয়োজনীয় সারের বরাদ্দ পাওয়া যাবে।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সার বিতরণ কার্যক্রম তদারকিকালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রিয়াংকা দাস কৃষকদের উদ্দেশ্যে ধৈর্য ধরে শৃঙ্খলা বজায় রেখে সার সংগ্রহের আহ্বান জানান।
তিনি সতর্ক করে বলেন, কেহ প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত সার উত্তোলন বা মজুদ করবেন না। কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে অপ্রয়োজনে সার উত্তোলন করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি তিনি জমিতে পরিমিত সার ব্যবহারে কৃষি অফিসের পরামর্শ নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন।
এদিকে উপজেলা কৃষি অফিস কেমিক্যাল সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকদের নিয়মিত জৈব সার (কম্পোস্ট/গোবর) ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, গত প্রায় ১৫ বছর ধরে উপজেলার সিংহভাগ কৃষকই জমিতে জৈব সার দেওয়া একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছেন।
এর পেছনের মূল কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, এলাকার জমির মালিকানা ব্যবস্থা, বর্গা প্রথা এবং দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাব। বর্তমানে বহু কৃষক ১০ থেকে ১৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি লিজ নিয়ে অথবা বর্গা নিয়ে জমিতে আম বাগান প্রতিষ্ঠা করছেন কিংবা নিবিড় ফসলের চাষ করছেন।
চুক্তিভিত্তিক চাষী হওয়ায় কেবল স্বল্পমেয়াদি ও দ্রুত মুনাফা অর্জনের দিকেই তাদের প্রধান দৃষ্টি থাকে। দ্রুত ফলন বৃদ্ধি ও তাৎক্ষণিক লাভের আশায় জমি লিজ গ্রহণকারীরা রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ করছেন। মাটির স্থায়িত্ব ও জৈব স্বাস্থ্যের দিকে নজর না দেওয়ায় নাচোল অঞ্চলের আবাদি জমির উর্বরতা শক্তি এখন আশঙ্কাজনক হারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জমিতে শতকরা অন্তত ৫ ভাগ জৈব পদার্থ থাকা আবশ্যক হলেও অতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারের ফলে স্থানীয় মাটিতে তা ১ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। দ্রুত মাটি রক্ষা ও জৈব সার ব্যবহারে সমন্বিত সচেতনতা না বাড়ালে আগামী দিনে এই অঞ্চলে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সুশীল সমাজ।